নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনটি বড় উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা

ইসরায়েলের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরের পাওয়া সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্রুত কাজে লাগানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোট। তিনি বলেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলার ব্যর্থতা ও সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়ানোর রাজনীতির বিরুদ্ধে ইসরায়েলিরা স্পষ্ট রায় দিয়েছেন।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে আইজেনকোট বলেন, নির্বাচনে অর্ধলক্ষাধিক নয়, বরং পাঁচ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলি নাগরিক নেতানিয়াহু সরকারের বিপক্ষে এবং পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

গত ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো ১২০ আসনের নেসেটে ৬৭টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিদায়ী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তবে বিরোধী শিবিরের ৬৭ আসনের মধ্যে জায়নবাদী দলগুলোর আসন মাত্র ৪৮টি। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে দুটি আরব দল। ফলে নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।

আইজেনকোটের মতে, নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রে সংসদই সরকারকে আস্থার ভিত্তি দেয়, সরকার সংসদকে নয়।’

ক্ষমতায় গেলে দ্রুত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আইজেনকোট।

প্রথমত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক অথবা বেসামরিক জাতীয় সেবা চালু করা।

তৃতীয়ত, নেতানিয়াহু সরকারের আমলে পাস হওয়া বিতর্কিত বিচার বিভাগীয় সংস্কার আইন বাতিল করা।

তার অভিযোগ, নির্বাচনে জনগণ বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা এবং সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে কিছু গোষ্ঠীর অব্যাহতির রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

নতুন সরকার গঠনে চার শর্ত

আইজেনকোট একটি বিস্তৃত ‘জায়নবাদী ও রাষ্ট্রনায়কোচিত সরকার’ গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে নতুন সরকারে অংশ নিতে আগ্রহী যেকোনো সংসদ সদস্যকে চারটি নীতিগত শর্ত মেনে নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শর্তগুলো হলো—

১. ইসরায়েলকে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

২. ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।

৩. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সামরিক অথবা বেসামরিক কাঠামোয় বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং গাজায় সংগঠনটির সামরিক ও শাসনক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্য মেনে নিতে হবে।

আইজেনকোট বলেন, ‘আমরা যে সরকার গঠন করব, তার দরজা এসব নীতি মেনে নেওয়া প্রত্যেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির জন্য খোলা।’

তার এই বক্তব্যকে আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং নেতানিয়াহুর জোট থেকে বেরিয়ে আসা সংসদ সদস্যদের সমর্থন পাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা

নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগেই ইরানের সঙ্গে আরেক দফা সামরিক সংঘাত শুরু করে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন—এমন খবরের প্রেক্ষাপটে সতর্কবার্তা দিয়েছেন আইজেনকোট।

তিনি জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত কেবল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হুমকি থাকলে এবং তা মোকাবিলায় অপেক্ষার সুযোগ না থাকলেই তিনি সামরিক অভিযান সমর্থন করবেন।

কারণ, ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলের ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে নতুন সরকার গঠনের আলোচনা ব্যাহত হতে পারে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনে এগিয়ে থেকেও সরকার গঠনে সংকটে বিরোধীরা

নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২১টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসন এবং আইজেনকোটের জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর ৪৮টি আসন—কোনোটিই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

এদিকে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়াশার পার্টির দাবি, নির্বাচনের দিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাদের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ইয়োভ কিশ ও উপপ্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উপমন্ত্রী আলমগ কোহেনের নামও উল্লেখ করা হয়।

তবে কোহেন দ্রুত এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইয়াশারের কোনো সদস্যের সঙ্গে তাঁর কথা হয়নি। তিনি অভিযোগটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেন।

রাজনৈতিক তাৎপর্য: নির্বাচনে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণ অনিশ্চিত রয়ে গেছে। আইজেনকোটের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে নতুন সরকার গঠনের আগেই ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদলকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল