যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছর শেষ হওয়ার আগেই তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্ব নিয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, এটি ট্রাম্পের নীতি, যুদ্ধকৌশল, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ওপরও এক ধরনের গণরায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে অর্থে প্রশ্ন উঠছে—মার্কিন ভোটাররা কি ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ‘লাল কার্ড’ দেখাতে যাচ্ছেন, নাকি শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকানরা ঘুরে দাঁড়াবেন?
জনপ্রিয়তায় ধস: নির্বাচনের আগের দিন প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা। দুই সপ্তাহ আগে এই হার নেমেছিল ৩১ শতাংশে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। একই জরিপে কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৪৬ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৮ শতাংশ ভোটারের পছন্দের কথা উঠে এসেছে। তবে আগের সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান ছিল ১১ পয়েন্ট; অর্থাৎ ব্যবধান কিছুটা কমেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম: ভোটারদের বড় উদ্বেগের জায়গা নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ৭৮ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কোন দল বেশি দক্ষ—এ প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৪৩ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩২ শতাংশ ভোটার মত দিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বৃদ্ধিও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ট্রাম্পবিরোধী ভোটের প্রবণতা: পিউ রিসার্চ সেন্টারের অক্টোবরের জরিপে ৬৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ট্রাম্প তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁদের মধ্যে ৪৪ শতাংশের কাছে ভোটটি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান জানানোর উপায়, বিপরীতে ১৯ শতাংশের কাছে এটি তাঁর প্রতি সমর্থনের প্রকাশ। একই জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩০ শতাংশ।
ডেমোক্র্যাটদের ভোটে আগ্রহ: রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ৪৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার বলেছেন, তাঁরা ভোট দিতে ‘খুবই আগ্রহী’; রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ৩৩ শতাংশ। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হচ্ছে। উচ্চকক্ষ সিনেটের ৩৫টি আসনও ভোটের আওতায়। ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত তিনটি আসন এবং সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চারটি আসন নিজেদের দখলে আনতে হবে।
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কৌশলবিদদের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি বলে ধারণা রয়েছে। কিন্তু সিনেটের হিসাব অনেক বেশি জটিল। সেখানে প্রায় ১০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় বাধা হলো আলাস্কা ও মিশিগানের মতো আসন। জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটের ব্যবধান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসনাল জেলার ফল আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়। ফলে জাতীয় জরিপে এগিয়ে থাকা মানেই কংগ্রেসের দুই কক্ষেই জয় নিশ্চিত নয়।
নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ ভোটার আগাম ভোট দেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে এবং ২ কোটি ৬৮ লাখ ভোটার ডাকযোগে ভোট দেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোটের তুলনায় এ সংখ্যা বেশি। তবে আগাম ভোটের সংখ্যা বা নিবন্ধিত দলীয় পরিচয় দিয়ে চূড়ান্ত ফল নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মাত্র দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে আসন হারানো এড়াতে পেরেছে—এমন তথ্য রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঐতিহাসিক প্রবণতাও রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ।
তবে ইতিহাসের এই প্রবণতা এবারও হুবহু ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের সংখ্যা, স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, ভোটার উপস্থিতি এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণ ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও সিনেটের লড়াইয়ে রিপাবলিকানদের অবস্থান এখনো শক্তিশালী হতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য পরাজয়ের অর্থ কী?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তাই এই নির্বাচনে তাঁর প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর প্রশ্ন নেই। তবে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁর প্রশাসনের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা বড় ধাক্কা খেতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহির চাপ বাড়তে পারে। বাজেট, নতুন আইন এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ বাস্তবায়নেও বাধার মুখে পড়তে পারেন প্রেসিডেন্ট। আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হলে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর দলের অবস্থান দুর্বল হবে। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের জন্য বড় রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হয়েছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা যদি দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ট্রাম্পের জন্য তা হবে বড় রাজনৈতিক স্বস্তি। এতে তাঁর নীতিগত অবস্থান আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি হবে এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপও কিছুটা কমতে পারে।
নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন বা বিরোধিতার গণভোট হিসেবে দেখা হলেও ভোটারদের সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম, অভিবাসননীতি, ইরান যুদ্ধ এবং প্রশাসনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুই ভোটের হিসাবকে প্রভাবিত করছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে অর্থনীতিকে ভোটারদের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতিও উল্লেখযোগ্য অসন্তোষের ইঙ্গিত রয়েছে। জরিপে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক ধারণা করেছেন, সংঘাত আরও ছয় মাস বা তার বেশি সময় চলতে পারে।