যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন তাঁর দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। যুদ্ধের প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়েছে—এমন মূল্যায়নের পর রিপাবলিকান শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দলের সমর্থকদের কাছে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এখন অনেকেই যুদ্ধের দায় ট্রাম্পের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন।
রিপাবলিকান শিবিরের এই অবস্থান পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের বক্তব্যে। তিনি সরাসরি ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনে দলের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের মূল কারণ এই যুদ্ধ। গত রাতেও প্রেসিডেন্ট একই কথা বলেছেন।’
ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজও যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, সংঘাতটি সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা না করলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের অবস্থান অপরিবর্তিত
নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের ভেতরে সমালোচনা বাড়লেও নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড় রয়েছেন ট্রাম্প। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল এবং আবার সুযোগ পেলেও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
ট্রাম্পের যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে সামরিক অভিযান জরুরি ছিল। তাঁর এই অবস্থান দলের অন্য নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে।
২০২৮ সালের নেতৃত্ব নিয়ে আগাম হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকান নেতাদের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদই তাঁর শেষ মেয়াদ হওয়ায় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে ট্রাম্পের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ইরান যুদ্ধের দায় থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রেখে দলের সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হতে পারে।
কাতারভিত্তিক জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান দলের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানে হামলার পক্ষে থাকা নেতারাও এখন যুদ্ধ পরিচালনা ও এর দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে, ভ্যান্স শুরু থেকেই বিদেশে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়ে আসছেন।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেটের মতে, ট্রাম্পকে নিঃশর্ত সমর্থন করা যে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, তা রিপাবলিকান নেতারা বুঝতে পারছেন। এ কারণে তাঁরা নিজেদের অবস্থান প্রেসিডেন্টের অবস্থান থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছেন।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে
ইরান যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বেড়েছে তেলের দাম। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ পর্যন্ত যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামরিক অভিযানের আর্থিক বোঝা ভোটারদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের চাপ বাড়তে পারে
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও আইনসভাগত চাপ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধে প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খান্না। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক ব্যয় এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ফলে ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতা যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না; বরং প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও অব্যাহত
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রস্তুতি বজায় রয়েছে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের সক্ষমতাও ধরে রেখেছে দেশটি। একই সময়ে কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও শান্তি আলোচনা চলছে।
এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে দুটি পথ—আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান অথবা সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা। রাজনৈতিক চাপের কারণে আলোচনার আগ্রহ বাড়তে পারে, আবার প্রশাসন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পথও বেছে নিতে পারে।
রিপাবলিকান নেতাদের একাংশের যুদ্ধ থেকে দূরত্ব তৈরির বিষয়টি তাই শুধু নীতিগত মতপার্থক্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্বাচনী পরাজয়ের দায়, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতিরও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে, আর যুদ্ধের অবসানের কৃতিত্ব কে দাবি করবে—সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও সামনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।