যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ যুদ্ধ। ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েল এবং ওই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে।
তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এই সংঘাত কেবল সীমিত অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে। এই যুদ্ধে ইরান ঠিক কী ধরনের মরণাস্ত্র ব্যবহার করছে, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আকাশপথে ইরানের বিমানবাহিনী তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় দেশটি গত কয়েক দশকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর শক্তি
- দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র: ২ থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
- মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র: দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার এসব ক্ষেপণাস্ত্রের তালিকায় রয়েছে শাহাব-৩, এমাদ, ঘাদর-১ এবং আধুনিক খেইবার শেকান। এগুলো কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের মার্কিন অবকাঠামো ধ্বংসের সামর্থ্য রাখে।
- স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র: ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার ফাতেহ সিরিজ ও জলফাগর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুত আঞ্চলিক হামলা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে অত্যন্ত কার্যকর।
- ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: সুমার ও কুদস সিরিজের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় রাডারে শনাক্ত করা ও প্রতিহত করা কঠিন।
ড্রোন প্রযুক্তি (UAV)
ইরানের ড্রোন বা ‘কামিকাজে ড্রোন’ এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এগুলো তুলনামূলক সস্তা হলেও ‘ঢেউয়ের মতো’ বা ঝাঁকে ঝাঁকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এতে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বিমানবন্দর বা জ্বালানি স্থাপনার মতো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা সহজ হয়।
ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’
ইরান দেশের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় পাহাড়ের নিচে বিশাল সুড়ঙ্গ ও লুকানো ঘাঁটি তৈরি করেছে, যাকে বলা হয় ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’। এসব সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র থেকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা যায়, যা শত্রুদেশের আগাম হামলা থেকে নিরাপদ।
নৌ-অস্ত্র ও হরমুজ প্রণালি
বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রয়েছে একক আধিপত্য। জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, শক্তিশালী জলজ মাইন এবং দ্রুতগতির আধুনিক নৌযান ব্যবহার করে ইরান যেকোনো সময় বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া তাদের হাইপারসনিক প্রযুক্তি ‘ফাত্তাহ’ সিরিজ বর্তমানে মার্কিন রণতরীগুলোর জন্য বড় আতঙ্ক।
ইরানি বিপ্লবী গার্ডের সংকেত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও এই যুদ্ধে যুক্ত হতে শুরু করেছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল ও রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সূত্র: আল–জাজিরা