মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সংঘাত চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ এখন কেবল পেশীশক্তি নয়, বরং এক বিশাল ‘অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক’ যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইরানের সস্তা আত্মঘাতী ড্রোনের মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দামী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সামরিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘অ্যাট্রিশন স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রতিপক্ষকে ক্ষয় করার রণকৌশল।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। ইরান এই যুদ্ধে মূলত তাদের ‘শাহেদ-১৩৬’ (Shahed-136) ড্রোন ব্যবহার করছে, যার প্রতিটির উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ হাজার ডলার (প্রায় ২৪ লাখ টাকা)। অন্যদিকে, এই ড্রোনগুলো ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যবহার করছে ‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের পিএসি-৩ মিসাইল। এই ধরনের প্রতিটি মিসাইলের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৪০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৮ কোটি টাকা)।
অর্থাৎ, মাত্র ২০ হাজার ডলারের একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে খরচ করতে হচ্ছে ৪ মিলিয়ন ডলারের একটি অত্যাধুনিক মিসাইল। এই বিশাল ব্যবধানই এখন মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) জানিয়েছে, প্যাট্রিয়ট মিসাইলগুলোর সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো মজুদের পরিমাণ নিয়ে। লকহিড মার্টিন কোম্পানি ২০২৫ সালে মাত্র ৬০০টি পিএসি-৩ মিসাইল তৈরি করেছে। অথচ গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইতোমধ্যে হাজার হাজার ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ছুড়তে হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কাতার বর্তমান হারে মিসাইল ব্যবহার করলে আগামী চার দিনের মধ্যে তাদের প্যাট্রিয়ট মিসাইলের মজুদ শেষ হয়ে যেতে পারে। যদিও কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, ইরানের হাতে প্রায় ২ হাজার ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং হাজার হাজার শাহেদ ড্রোন রয়েছে। রাশিয়াও প্রতিদিন শত শত শাহেদ ড্রোন তৈরি করছে, যা ইরানের শক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত শনিবারের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান তাদের ‘অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল আরও জোরদার করেছে। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক কেলি গ্রিকো বলেন, ‘ইরান হিসাব করছে যে তারা ড্রোন পাঠিয়ে মিত্রদের মিসাইল মজুদ শেষ করে দেবে। এতে একসময় উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক মনোবল ভেঙে পড়বে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাপ দেবে।’
ইসরায়েলের নিরাপত্তা ক্যাবিনেট সদস্য এলি কোহেন জানিয়েছেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইতোমধ্যে ইরানের প্রায় ১৫০টি মিসাইল লঞ্চার এবং ভূগর্ভস্থ টানেল ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করে ইরানের হামলা করার সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ ৪ সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার অনুমান করলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘এটি অন্তহীন কোনো যুদ্ধ হবে না।’ তবে ড্রোনের মাধ্যমে দামী মিসাইল শেষ করার এই ‘মিসাইল ম্যাথ’ যদি ইরানের পক্ষে যায়, তবে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের কৌশলগত সংকটে পড়তে পারে।