ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ‘এন্ডগেম’ কী?

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এবার লক্ষ্য ইরান। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ এই অভিযান দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করলেও খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। ইরানের ওপর মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চললেও প্রশ্ন উঠেছে- আসলে কী চাচ্ছেন ট্রাম্প? এই যুদ্ধের ‘এন্ডগেম’ বা শেষ পরিণতিই বা কী?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ইরানজুড়ে প্রায় ২,০০০ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে মার্কিন বাহিনী। হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এছাড়া তেল শোধনাগার, পারমাণবিক স্থাপনা এবং বেসামরিক এলাকায় হামলার ফলে নিহতের সংখ্যা ১,২০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ১৬০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েল ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল ও বার্তাগুলোর মধ্যে চরম অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কখনও তিনি ইরানের আইআরজিসি (IRGC) কর্মকর্তাদের অস্ত্র সমর্পণের বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছেন, আবার কখনও সামাজিক মাধ্যমে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ (Unconditional Surrender) দাবি করছেন।

ট্রাম্প সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা না বললেও খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে ঘোষণা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন চেয়েছিল খামেনির মৃত্যুর পর ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে ফাটল ধরবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে আইআরজিসি ও সরকার আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

কিং’স কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।’ এদিকে ইরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বোমাবর্ষণ চলাকালীন কোনো আলোচনা বা আত্মসমর্পণ সম্ভব নয়।

ইসরায়েল এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। কাতার ইউনিভার্সিটির গবেষক মাহজুব জুইরির মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালিয়েছিল, ইসরায়েলও ৭ অক্টোবরকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইরানসহ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের নির্মূল করতে চাইছে।

ট্রাম্প যেহেতু যুদ্ধবিরোধী প্ল্যাটফর্মে নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসেছেন, তাই দীর্ঘমেয়াদী স্থল অভিযান বা ‘গ্রাউন্ড ইনভেশন’-এর ঝুঁকি তিনি নিতে চাইবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত একটি ‘বাস্তববাদী চুক্তি’ (Pragmatic Deal) করার চেষ্টা করবেন যেখানে তিনি খামেনির মৃত্যু এবং ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংসকে নিজের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করতে পারেন।

সূত্র: আল-জাজিরা।