যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের ৫০তম দিনে এসে পরিস্থিতি একই সঙ্গে জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রভাব, সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে একটি অনিশ্চিত বাস্তবতা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দাবি করছেন যে আলোচনায় আর কোনো বড় জটিলতা নেই, অন্যদিকে ইরান সেই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানাচ্ছে যে বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সহজ নয় এবং আলোচনার বার্তায় স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা থাকলেও তা নির্দিষ্ট শর্ত ও সমন্বয়ের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেহরান প্রণালি বন্ধ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তাদের মজুত কোনোভাবেই অন্য কোথাও হস্তান্তর করা হবে না বলে জানানো হয়েছে, যা ট্রাম্পের দাবির সরাসরি বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে প্রণালিতে প্রচলিত টোল না থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে নতুন ফি আরোপের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে, যেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য আগাম সমন্বয় বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যুদ্ধবিরতির পর একটি নতুন সমঝোতার দিকে এগোনোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি বহুজাতিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দেবে।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে সমর্থন দিয়েছেন এবং সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরের কথাও উল্লেখ করেছেন। একই সময়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি সমর্থকেরা লেবাননের প্রতি সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করেছে এবং প্রয়োজনে যুদ্ধে জড়ানোর সতর্কতা দিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহামেদ আল জাদান প্রণালি খোলার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও পরিস্থিতিকে এখনো নাজুক বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ভিন্ন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাশিয়ার তেলের ওপর শিথিলতা বাড়ানো হয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে, একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বহাল রাখা হয়েছে এবং ইউনাইটেড স্টেটস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে বেশ কয়েকটি জাহাজ তাদের নির্দেশনা মেনে ফিরে গেছে।
ট্রাম্প একদিকে আলোচনার অগ্রগতির কথা বললেও অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি নবায়ন অনিশ্চিত বলে সতর্ক করেছেন এবং ন্যাটোর সম্পৃক্ততার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জোটটিকে কার্যত দূরে থাকার বার্তা দিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান এখনো শেষ হয়নি, যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র নির্দেশ দিয়েছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি, একটি হামলায় একজন নিহত হওয়ার খবর এসেছে, আর দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
বিশ্লেষক রামি খৌরি মনে করেন, এই সংঘাত দীর্ঘদিনের প্রভাব ও প্রতিরোধের প্রতিফলন, যা ভবিষ্যতে সামরিক সংঘাত থেকে আলোচনার পথে মোড় নিতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাবও স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণার পর তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে। সূত্র: আলজাজিরা