আলজাজিরার বিশ্লেষণ

গাজায় কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ধারাবাহিক সহিংসতার প্রভাবে বহু শিশু হঠাৎ করে কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছে, যা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

পাঁচ বছর বয়সী জাদ জোহুদ তার বাড়ির কাছে তীব্র বোমাবর্ষণের পর হঠাৎ করেই কথা বলা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং গাজার বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে মাথায় আঘাত, স্নায়বিক ক্ষতি বা বিস্ফোরণের অভিঘাতের কারণে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো শারীরিক আঘাত ছাড়াই শিশুরা নীরব হয়ে যাচ্ছে, যা চরম মানসিক ট্রমার ফল।

শিশু মনোচিকিৎসক ক্যাটরিন গ্ল্যাটজ, যিনি 'ডক্টরস উইথ আউট বর্ডার্স'-এর সঙ্গে কাজ করেছেন, এই পরিস্থিতিকে 'নীরব যন্ত্রণা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ধ্বংসযজ্ঞের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে।

গাজা সিটির হামাদ হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের মধ্যে হঠাৎ কথা বলার ক্ষমতা হারানোর ঘটনা বাড়ছে। হাসপাতালের স্পিচ বিভাগের প্রধান মূস আল খোরতি  বলেন, কিছু ক্ষেত্রে শিশু সম্পূর্ণভাবে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা সিলেকটিভ মিউটিজম বা চরম মানসিক চাপজনিত স্বরহানির মতো অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই সমস্যার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন চরম মানসিক আঘাত। পরিবার হারানো, মৃত্যুদৃশ্য প্রত্যক্ষ করা, নিজে আহত হওয়া কিংবা বারবার সহিংসতার মধ্যে থাকা, এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক শিশু 'ফ্রিজ রেসপন্স'-এ চলে যায়, যেখানে শরীর হুমকির মুখে নিজেকে স্থির করে ফেলে এবং প্রতিক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়া শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা শিশুদের শেখা, খেলাধুলা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকেও ব্যাহত করছে, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজার পরিস্থিতি অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় আরও ভয়াবহ, কারণ এখানে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা ধীর ও জটিল প্রক্রিয়া। দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া শিশুদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা কঠিন।

তবুও ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন, যেমন ধীরে ধীরে প্রতিক্রিয়া দেখানো বা স্বল্পমাত্রায় যোগাযোগ শুরু করা, পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।  সূত্র: আলজাজিরা