ইরানের মিত্রদের প্রস্তুতির নির্দেশ, যেকোনো মুহূর্তে ইসরায়েলে হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ইরান। লেবাননের সংবাদপত্র নিদা আল ওয়াতান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান হিজবুল্লাহসহ ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অন্তর্ভুক্ত মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করলে ইসরায়েলও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজা উপলক্ষে তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে ইরানের মিত্রদের জানানো হয়, ‘অপেক্ষার সময় শেষের দিকে’ এবং এখন সামরিক প্রস্তুতিই অগ্রাধিকার। বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সংঘাত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বড় ও ভয়াবহ হতে পারে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) প্রকাশিত এই প্রতিবেদন এমন সময় সামনে এলো, যখন এক মাস আগে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে।

এ পর্যন্ত চলমান নতুন সংঘাতে ইসরায়েল সরাসরি অংশ নেয়নি এবং ইরানও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তবে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত মার্চে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরু করার পর দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়, সীমান্তবর্তী একটি বাফার জোনের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ২০২৪ সালের সংঘাতে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশকে নির্মূল করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা একাধিক ধাক্কা খেলেও তেহরান এখনো হিজবুল্লাহকেই নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনভিত্তিক হুথি গোষ্ঠীর মতো অন্যান্য ইরান-সমর্থিত সংগঠনও অতীতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।

এদিকে টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির ধারাবাহিকতায় এবার সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি থেকে বিরত রাখা।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ওমান উপসাগরের চাবাহার বন্দরে অবস্থিত একটি নজরদারি টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছে, যা আইআরজিসি বাণিজ্যিক জাহাজ পর্যবেক্ষণ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহার করত। সেন্টকমের ভাষ্য, এই স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তারা এ হামলার ভিডিওও প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। হামলায় হরমুজগান প্রদেশের ছয়টি সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ও সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার মোহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও কয়েকদিন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইরান ‘পূর্ণমাত্রার আক্রমণাত্মক অভিযানে’ যাবে।

জবাবে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বিমান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং কয়েকটি রিফুয়েলিং বিমান ও যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে কাতারে মার্কিন রাডার ব্যবস্থা ও সামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।

জর্ডান জানিয়েছে, তারা নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।

ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সতর্কবার্তা অমান্য করে চলাচলের চেষ্টা করায় একটি থাই পতাকাবাহী জাহাজকে আইআরজিসি নৌবাহিনী লক্ষ্যবস্তু করেছে।

আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার মাজিদ মুসাভি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও হরমুজ প্রণালিতে হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত তাদের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে। তার ভাষায়, ‘তেহরান থেকে দক্ষিণাঞ্চল, সবই ইরানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই পুরো দেশ থেকেই শত্রুর বিরুদ্ধে কার্যকর হামলা চলবে।’

এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্র ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে আগুন লেগে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন হামলায় কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন।

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরান-সমর্থিত হামলায় একটি ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীর আট সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটি। অন্যদিকে কুর্দি বাহিনী দাবি করেছে, তারা এরবিলের আকাশে আটটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

পরিস্থিতির এই দ্রুত অবনতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল