ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃদেশীয় লেনদেন সহজ করতে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে ব্রিকস বিজনেস ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি বা আর্থিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়লে এর প্রভাব শুধু ওই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কার্যকর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থায়ন নেটওয়ার্কে রূপান্তর করতে পারলেই ব্রিকসের প্রকৃত শক্তি দৃশ্যমান হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে বাণিজ্য অংশীদার, অর্থায়নের উৎস ও লেনদেনের পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগে অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহারের প্রবণতা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কোনো দেশ যাতে আর্থিক বা প্রযুক্তিগত উপকরণের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বৈধ বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য ব্রিকসের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাণিজ্য সহজ করতে শুল্ক ও কাস্টমস কার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেন তিনি। প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো, সীমান্তপারের বাজার সম্প্রসারণ এবং যৌথভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
কাঁচামালনির্ভর বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা ও যৌথ শিল্প উৎপাদনের দিকে যেতে মান নির্ধারণে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান পেজেশকিয়ান।
খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ইরানের বিপুল জ্বালানি মজুত ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। ব্রিকসের জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন সরবরাহব্যবস্থায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে তেহরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়াতে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন পেজেশকিয়ান। বিশেষ ঋণসুবিধা, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে নিশ্চয়তার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১০ বিলিয়ন ডলার প্রাথমিক মূলধন নিয়ে একটি যৌথ ব্রিকস পুনর্বীমা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, এমন উদ্যোগ বেসরকারি খাতের আস্থা বাড়াতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্রিকসকে শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা না থেকে জ্ঞান উৎপাদন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মানদণ্ড তৈরিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান পেজেশকিয়ান। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ব্রিকস বিজনেস কাউন্সিলকে শুধু আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না রেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতার কার্যকর চালিকাশক্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট। এ ক্ষেত্রে আন্তঃব্রিকস বাণিজ্য বৃদ্ধির হার, বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রার অংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণের মতো পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে বাস্তব প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সবশেষে পেজেশকিয়ান বলেন, আরও উন্মুক্ত, স্থিতিস্থাপক ও ন্যায়সংগত অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্রিকসের সব সদস্য দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত ইরান। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি