ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে হুথি বাহিনী। দ্রুতগতির সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকা দখলের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব নৌপথের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে হুথিদের এই অগ্রযাত্রা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য এর প্রভাব বড় হতে পারে। কারণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এখন সৌদি তেল রপ্তানির জন্য আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মোকা দখল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বৃহস্পতিবার হুথিরা মোকা বন্দরনগরীর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই শহরটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
মোকা দখলের মাধ্যমে হুথিরা শুধু একটি শহর বা বন্দর নিয়ন্ত্রণে নেয়নি; তারা লোহিত সাগরের একটি দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এর ফলে বাব আল-মান্দাবের দিকে তাদের সামরিক ও নৌ সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগও বেড়েছে।
ইয়েমেনের সরকার সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট। ফলে মোকা ও পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রা সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর জন্য বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাব আল-মান্দাবই মূল চাবিকাঠি
লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালি। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট এটি।
হুথিদের সামরিক অবস্থান যদি বাব আল-মান্দাবের আশপাশে আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়বে।
তবে লোহিত সাগরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেখানে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার সক্ষমতা দুটি এক বিষয় নয়। বিশাল সমুদ্রাঞ্চল কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুধু উপকূলীয় ভূখণ্ড দখল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী নৌবাহিনী, নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা, দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র এবং নিয়মিত সামুদ্রিক টহল।
সৌদি তেল রপ্তানিতে বাড়ছে ঝুঁকি
হুথিরা চলতি বছরের শুরুতেই লোহিত সাগরে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। এখন পশ্চিম উপকূলে তাদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ায় সেই হুমকির বাস্তব গুরুত্ব বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বা অবরোধের কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে এই নৌপথও যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাহলে সৌদি আরবের জন্য জ্বালানি রপ্তানির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
এটি শুধু সৌদি আরবের সমস্যা নয়। বিশ্বের তেলবাজারে সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং জাহাজের বীমা খরচের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে হুথিরা কি সত্যিই লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হুথিদের হাতে উপকূলের বড় অংশ চলে যাওয়া তাদের সামরিক সুবিধা বাড়িয়েছে। কিন্তু পুরো লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জ।
লোহিত সাগরের আয়তন বিশাল এবং এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইয়েমেনের উপকূলের বাইরে। অন্যদিকে সৌদি আরব, মিসর, জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোরও এই অঞ্চলে সরাসরি নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে লোহিত সাগর ও আশপাশের জলপথে উপস্থিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় এসব শক্তির সামরিক উপস্থিতি হুথিদের জন্য বড় বাধা।
ফলে হুথিদের পক্ষে পুরো সমুদ্রের ওপর স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তারা যদি উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বিস্ফোরক নৌযান বা অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করে নির্দিষ্ট নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে, তাহলে কার্যত সমুদ্রের একটি অংশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’ বানানো সম্ভব।
আসল শক্তি ‘নিয়ন্ত্রণে’ নয়, ‘বাধা দেওয়ার’ ক্ষমতায়
হুথিদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি হয়তো পুরো লোহিত সাগর দখল করা নয়; বরং বাণিজ্যিক জাহাজকে সেখানে চলাচল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করা।
একটি আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে প্রতিটি জাহাজ ধ্বংস করা প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি সফল হামলা, নিয়মিত হুমকি এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করলেই জাহাজ মালিকেরা বিকল্প রুট বেছে নিতে পারেন।
এর ফলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বাড়ে জ্বালানি, সময়, বীমা ও পরিবহন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের বোঝা ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সম্পর্ক। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
হুথিদের অগ্রযাত্রা তাই শুধু ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতারও অংশ হয়ে উঠছে।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন। একদিকে নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ করলে আবার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
হুথিরা যদি পশ্চিম উপকূলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে এবং বাব আল-মান্দাবের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে, তাহলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তবে ‘লোহিত সাগর হুথিদের নিয়ন্ত্রণে’-এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, তারা লোহিত সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অর্জন করছে এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করার অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
আর এই সক্ষমতাই যদি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধের প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত লোহিত সাগরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু হুথিদের সামরিক সাফল্য নয় সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান এবং ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ কোন দিকে যায়, তার ওপরও।