ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রাম্পের হলিউড-ধাঁচের কৌশল

ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাত মাস কেটে গেলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বা দৃশ্যমান রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেনি। রণাঙ্গনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ না দেখে হোয়াইট হাউস সাধারণ মানুষের সামনে একটি ‘জয়ের গল্প’ সাজাতে পুরোপুরি মিডিয়া স্টান্টের ওপর ভরসা করছে।

সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত এক মার্কিন ফাইটার জেটের পাইলটকে উদ্ধার করার পুরো ঘটনাকে হলিউডের মারকাটারি সিনেমার ধাঁচে মার্কিন জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ বাহিনীর রোমাঞ্চকর অভিযান, রক্তাক্ত পাইলট, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা আর সামরিক বিমানের চোখধাঁধানো দৃশ্য দিয়ে এমনভাবে গল্পটি ফাঁদা হয়েছে, যেন সাধারণ দর্শক একদম মূল গোড়ার খবরটি বেমালুম ভুলে যায়।

যে ঘটনাটিকে আমেরিকার বড় মাপের জয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার আসল সূচনা কিন্তু একটি এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমান খসে পড়ার মধ্য দিয়ে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা আর সামরিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে খুব দ্রুতই ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করবেন। বাস্তবে সাত মাস পার হলেও কোনো রাজনৈতিক কৌশলগত অর্জন আমেরিকা পকেটে পুরতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা আড়াল করতে ওই উদ্ধার অভিযানকেই তাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে জাহির করছে।

এমনকি মার্কিন সরকারের তৈরি করা এই ‘বীরত্বগাথা’ নিয়ে খোদ বিশেষজ্ঞ মহলেই তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর গুরুতর আহত হয়েও পাইলট নাকি নিজ পায়ে হেঁটে সাত হাজার ফুট উঁচুতে পাহাড়ি চূড়ায় উঠে যান। কোনো স্পষ্ট চিকিৎসা বা সামরিক ব্যাখ্যা ছাড়া মেরুদণ্ড, হাত ও কাঁধে গভীর ক্ষত নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেই বাস্তব পরিস্থিতি ধামাচাপা দিয়ে বানোয়াট এক বীরত্বের গল্প উপস্থাপন করা হয়েছে।

পেন্টাগনের এই মিডিয়া কৌশল মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ট্রাম্পের তলানিতে গিয়ে ঠেকা জনপ্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণ ভোটারদের কাছে যুদ্ধটিকে একটি সফল অভিযান হিসেবে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৬০ ভাগ আমেরিকানই ইরান যুদ্ধকে একদম অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত ব্যয়বহুল মনে করেন। উপরন্তু ৪৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব আরো দুর্বল হয়েছে। সিবিএস ও ইউগভ-এর যৌথ জরিপেও একই চিত্র স্পষ্ট; যেখানে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে এই সামরিক অভিযান উপকারের চেয়ে জটিলতাই বেশি বাড়িয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোস-এর জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে মাত্র ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর পুরো কার্যকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। ঠিক এমন এক মুহূর্তে পেন্টাগনের এই সিনেমাটিক বয়ান গণমাধ্যমে জোর করে ঠেলে দেওয়ার নেপথ্য কাহিনী ফাঁস করে দেয় সিএনএন। সংবাদ মাধ্যমটির বিশেষ প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দপ্তর নিজেই ‘সিক্সটি মিনিটস’ নামের জনপ্রিয় টেলিভিশন শো-তে উদ্ধার হওয়া পাইলটকে উপস্থিত করতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার ও গোপনীয় তথ্য ফাঁসের ঝুঁকিতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিমানে থাকা দুইজনের একজন সরাসরি সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতিও জানান। যদিও পেন্টাগন দাবি করেছে যে পুরো বিষয়টিই সেনাসদস্যদের নিজেদের ইচ্ছায় ঘটেছে।

একটি বিধ্বস্ত বিমান থেকে সেনাসদস্যকে নিরাপদে বের করে আনা প্রতিটি পেশাদার বাহিনীরই মৌলিক দায়িত্ব। তবে সামরিক বাহিনীর এই কৌশলগত সাফল্য দিয়ে কি যুদ্ধের ভয়াবহ রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে রাখা সম্ভব? আকাশচুম্বী জিনিসপত্রের দাম, যুদ্ধের বিরাট আর্থিক খরচ এবং সেনা হতাহতের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন জনগণ আসল সত্যটি ধরে ফেলেছে। ক্যামেরার লেন্স বা হলিউডি ড্রামা দিয়ে সাময়িকভাবে যুদ্ধের মূল ছবি ঘুরিয়ে দেওয়া গেলেও, ইতিহাস ও বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটানো যায় না।

সূত্র:মেহর নিউজ এজেন্সি