সৌদি আরবে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি)। বেসামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলাকে ‘কঠোরতম ভাষায়’ নিন্দা জানিয়ে হুথিদের অবিলম্বে সামরিক উত্তেজনা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে পরিষদ।
নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের হামলার কথা উল্লেখ করা হয়। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদ হুথিদের উদ্দেশে অবিলম্বে সামরিক উত্তেজনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত না করার ওপর জোর দিয়েছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক সহকারী মহাসচিব খালেদ খিয়ারি ১৫ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরও অস্থিতিশীল হয়েছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে লড়াই তীব্র হওয়ার পাশাপাশি হুথিরা বাব আল-মান্দাবের দিকে অগ্রসর হয়েছে বলে তিনি জানান।
খিয়ারি বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সম্মান করতে হবে।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও নিরাপত্তা পরিষদ উদ্বেগ জানিয়েছে।
২০২৪ সালের নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ২৭২২-এ বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুথিদের হামলা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান আবারও সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, বাব আল-মান্দাবের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদ সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দেশটির আত্মরক্ষার ‘অন্তর্নিহিত অধিকার’ স্বীকার করেছে।
তবে একই সঙ্গে জাতিসংঘ ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অর্থাৎ, একদিকে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলার নিন্দা এবং দেশটির আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকার করা হয়েছে; অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাতকে সামরিকভাবে আরও বিস্তৃত না করে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ফেরার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই নতুন করে তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম উপকূলের সংঘাতের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, সাম্প্রতিক সংঘাতে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ ইয়েমেনের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়েছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ইয়েমেনের সংকটের সঙ্গে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে খালেদ খিয়ারি বলেন, হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
জাতিসংঘের বার্তা মূলত তিনটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত: সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলা বন্ধ করা, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়া ঠেকানো।