ট্রাম্প-এরদোয়ান বৈঠকের আগে কূটনৈতিক তৎপরতা

মার্কিন প্রতিরক্ষা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বহুল আলোচিত এস-৪০০ বিতর্কের সমাধান খুঁজতে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রত্যাশিত বৈঠকের আগে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে তুরস্ক। এই তথ্য জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

শনিবার তুর্কি সম্প্রচার মাধ্যম এনটিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে দুই নেতার সম্ভাব্য সাক্ষাতের আগে আঙ্কারা ও ওয়াশিংটন এই মতবিরোধ নিরসনে ‘সৃজনশীল’ কিছু ধারণা নিয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য একটি বড় বাধা, বিশেষত আমাদের প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষেত্রে। আমরা এটি প্রত্যাহারের চেষ্টা করছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার সূত্রপাত যে এস-৪০০ ইস্যু থেকে, তা সমাধানেও কিছু সৃজনশীল প্রস্তাব রয়েছে। পারস্পরিক সদিচ্ছার ভিত্তিতে আমরা এসব সমাধান বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আশা করি এ ব্যাপারে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।’

আঙ্কারায় এরদোয়ান-ট্রাম্পের সর্বশেষ বৈঠক এবং তার পরবর্তী যোগাযোগের প্রসঙ্গ টেনে ফিদান জানান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করা এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই। তবে এস-৪০০ সমস্যা সমাধানে ঠিক কী কী প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি তিনি।

ইতিমধ্যে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন এরদোয়ান। ফিদানের ভাষ্যমতে, সেখানে তিনি বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিস্তৃত পরিসরে বক্তব্য রাখবেন, যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপের আহ্বানও থাকবে।

ক্যাটসা আসলে কী?

কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট বা সংক্ষেপে ক্যাটসা হলো ২০১৭ সালে প্রণীত একটি মার্কিন আইন, যা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা খাতের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখে। তুরস্কের ওপর আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা মূলত দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বা সামগ্রিক অর্থনীতিকে নয়, বরং প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (এসএসবি) এবং এর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে প্রযোজ্য হয়েছিল। এর আওতায় ছিল এসএসবির জন্য মার্কিন রপ্তানি লাইসেন্স বন্ধ, ঋণ ও অর্থায়নে বিধিনিষেধ এবং চিহ্নিত কর্মকর্তাদের ভিসা সীমাবদ্ধতা। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অর্থায়নে তুরস্কের প্রবেশাধিকার সহজ হবে এবং যৌথ সামরিক প্রকল্পে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পথ খুলে যাবে।

এস-৪০০ ক্রয় থেকে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত

রাশিয়া থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার সিদ্ধান্তই মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে তুরস্কের এই বিরোধের সূত্রপাত ঘটায়। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ছিল, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি এই রুশ প্রযুক্তি পরিচালনা করলে বিমানটির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই যুক্তিতে ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় ওয়াশিংটন এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আরোপ করে ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা।

তবে আঙ্কারা বরাবরই বলে এসেছে, নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে এস-৪০০ কেনা ছিল তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে দুই ব্যবস্থার সামঞ্জস্যতা যাচাইয়ে একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছিল তুরস্ক। দেশটির কর্মকর্তারা বারবারই এই নিষেধাজ্ঞাকে অন্যায্য এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ বলে সমালোচনা করে আসছেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে গত ৭ জুলাই আঙ্কারায় এরদোয়ানের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছি। এখনই সময় এটা করার, আমরা বন্ধুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে চাই না। বিষয়টা খুবই সহজ।’

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড