ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা-অবরোধ, পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি তেহরানের

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ আরও জোরদার হওয়ার মধ্যে তেহরান ও ইসরায়েল থেকেও নতুন করে সতর্কবার্তা এসেছে। একদিকে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে; অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, নতুন হামলা হলে আগের চেয়েও কঠোর ও অনির্দেশ্য পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।

তবে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো মধ্যস্থতাভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সমঝোতার সম্ভাবনাও এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

ইরানের ওপর চাপের নতুন মাত্রা

ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক অভিযানের অন্যতম প্রধান মুখ মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর নেতৃত্বে ওয়াশিংটন ‘Operation Economic Outcast’ নামে ইরানের রাজস্ব ও আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগ সংকুচিত করার কর্মসূচি চালাচ্ছে।

আগস্টে বেসেন্ট ঘোষণা করেন, ইরানের তেলসহ রাজস্বের উৎসগুলোকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা হবে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চাপের আওতায় এসেছে ইরানের বিমান চলাচলও। বেসেন্ট ঘোষণা করেছিলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হবে এবং যেসব বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী বা অন্যান্য কোম্পানি এসব বিমানকে সেবা দেবে, তারাও মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়বে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা গেছে। ইরান ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তেহরান-ভিত্তিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। ইরাকের বাগদাদ ও ওমানের মাসকাটে ইরানি বিমান চলাচলও সীমিত হয়েছে।

তবে সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়নি। বুধবারও ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করেছে বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে তাঁর সামনে দেশটির বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের পথ খোলা রয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন এবং একই সঙ্গে তেহরানকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার সুযোগের কথাও বলেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষও পাল্টা সতর্কবার্তা দেয়।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এবং খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরানের জবাব হবে আরও কঠোর, ব্যাপক ও অনির্দেশ্য।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ইসরায়েলও সতর্ক অবস্থানে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং দেশটির মিত্র ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়েও ইসরায়েল সতর্ক রয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা বাড়লে ইসরায়েলও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতের নতুন পর্যায়ে জড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছে।

হরমুজ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি।

ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপ ও ইরানি বন্দরগুলোর নৌ অবরোধ কমায়, তাহলে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায় হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকুক এবং ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো মেনে নিক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান এখনো বড়।

হরমুজের গুরুত্ব শুধু ইরান বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নয়। বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তেলের দাম, জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে।

চাপের পাশাপাশি আলোচনাও

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো একই সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিচ্ছে, তখন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনাতেও বসেছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির যোগাযোগ হয়। আলোচনায় হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদসহ বিভিন্ন বিষয়ে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

কাতারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। দেশটি হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।

তবে আলোচনায় বড় বাধা রয়ে গেছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। ইরান প্রথমে নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর দাবি করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে অবাধ নৌ চলাচল ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি চাইছে।

একই সঙ্গে যুদ্ধ ও কূটনীতি

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো যুদ্ধের ভাষা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ পাশাপাশি চলছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ খুঁজছে। প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য দেওয়া একদিকে নিজ নিজ দেশের জনগণ ও মিত্রদের কাছে শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের সুযোগ দিচ্ছে; অন্যদিকে গোপন বা মধ্যস্থতাভিত্তিক আলোচনা সম্ভাব্য সমঝোতার জায়গা তৈরি করছে।

কিন্তু এই কৌশলের ঝুঁকিও রয়েছে। আলোচনার পাশাপাশি যদি বড় কোনো সামরিক হামলা, মার্কিন সেনা হতাহত, ইসরায়েলি হামলা কিংবা ইয়েমেন থেকে নতুন আঞ্চলিক হামলা শুরু হয়, তাহলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আবারও ভেঙে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এখন অর্থনীতি, বিমান চলাচল, তেলবাণিজ্য ও নৌপথ বহু ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। তেহরানও পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে জাতিসংঘের মঞ্চে কূটনৈতিক যোগাযোগের নতুন পথও তৈরি হয়েছে।

তাই সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কতটা বাড়ে এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের আলোচনায় বাস্তব কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না।