ইরানে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য হিজবুল্লাহর একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে কুম ও তেহরানে চারটি সেফ হাউস ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর বহিরাগত অভিযান ইউনিট প্রায় পাঁচ বছর আগে ইরানের আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অস্ত্র পরিচালনা, নাশকতা, সাইবার হামলা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই নিয়োগ কার্যক্রম ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৮ বছর আগে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে ৬০টিরও বেশি দেশে এর শাখা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশীয় নাগরিক ও আল-মুস্তাফার সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান ইরানে হিজবুল্লাহর এই কার্যক্রম তদারক করেন। কুদস ফোর্সের কমান্ডারদের তত্ত্বাবধানে তিনি হিজবুল্লাহর বহিরাগত অভিযান ইউনিটের প্রধান তালাল হামিয়াহর হয়ে কাজ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
হাসানের নির্দেশনায় ইরানের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহর নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য একাধিক গোপন আস্তানা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কুম ও তেহরানের চারটি স্থাপনার অবস্থান শনাক্ত করার দাবি করা হয়েছে।
কুমের ভেলায়াত এলাকায় কাশানে-২ টাওয়ারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেহরানে নাফত এলাকার সেভেন্থ কিশ স্ট্রিট, রাহ আহান এলাকার থার্ড ওয়েস্ট সারভেস্তান স্ট্রিট এবং পুনাক এলাকার আলবোরজ স্ট্রিটের পাশের সারভ গলির তিনটি স্থাপনাকেও গোপন আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুদস ফোর্স ও হিজবুল্লাহ এসব স্থাপনা নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের আশ্রয় দেওয়া ও প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করে।
হামিয়াহকে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। হিজবুল্লাহর কার্যক্রমে সহযোগিতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁকে নিয়ে তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিজবুল্লাহর বহিরাগত অভিযান ইউনিটের প্রথম কমান্ডার ছিলেন ইমাদ মুগনিয়েহ। ২০০৮ সালে তিনি নিহত হন। ইউনিটটির প্রাথমিক পর্যায়ের চার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে মুগনিয়েহর পাশাপাশি ছিলেন মোস্তফা বদরেদ্দিন, তালাল হামিয়াহ এবং তৎকালীন কুদস ফোর্সের কমান্ডার ও বর্তমানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান আহমাদ ওয়াহিদি। বদরেদ্দিন নিহত হওয়ার পর হামিয়াহ ইউনিটটির নেতৃত্ব নেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইরানে এই নিয়োগ কার্যক্রমে হাবিব মোস্তফা জাআতার নামে এক ধর্মীয় ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেবাননের জাবাল আমেল অঞ্চলে জন্ম নেওয়া জাআতার কুমে বসবাস করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং বছরে কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
কুমের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি শরহ আল-লুমআ ও হুদুদ-সংক্রান্ত বিষয় পড়ান। পাশাপাশি নূর ইসলামিক সেন্টার ও হিকমত আন্তর্জাতিক একাডেমিতে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ইংরেজিতে শিয়া ধর্মীয় বিষয় পড়ান বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার ইংরেজি ভাষাজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানে হিজবুল্লাহর হয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুপ্ত সেলের সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এমন চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার আহমাদ জাকি ফাতোনি, আহমাদ জিলাল মুখলিস, সৈয়দ মোহাম্মদ মাহদি আলী আল-আত্তাস এবং মোহাম্মদ সালেহ।
ফাতোনি ইন্দোনেশিয়ার আহলুল বাইত ফাউন্ডেশনের আঞ্চলিক নেতৃত্ব পরিষদের প্রধান এবং আল-মুস্তাফা সাবেক শিক্ষার্থী সমিতির সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শরতে তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নাহজ আল-বালাগা ও আলাভি শাসনবিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
আহমাদ জিলাল মুখলিসও আল-মুস্তাফা সাবেক শিক্ষার্থী সমিতির সদস্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরেক ইন্দোনেশীয় নাগরিক সৈয়দ মোহাম্মদ মাহদি আলী আল-আত্তাস ইরানে অধ্যয়নরত ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থীদের সংগঠনের প্রধান এবং ইন্দোনেশিয়ার আহলুল বাইত কাউন্সিলের সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি একটি পডকাস্ট পরিচালনা করেন, যেখানে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন এবং ইসরায়েল ও ইহুদিবাদবিরোধী বক্তব্য দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কুমে আয়োজিত সরকারি কুদস দিবসের একটি মিছিলেও তার উপস্থিতির ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
চতুর্থ ব্যক্তি মোহাম্মদ সালেহ আল-মুস্তাফার শিক্ষার্থী এবং ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠনের সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার ধর্মীয় শিক্ষার্থী সংগঠনের সদস্য হিসেবে তিনি আহলুল বাইত বিশ্ব সমিতির মহাসচিব রেজা রামাজানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারপন্থী একটি সমাবেশেও সালেহ উপস্থিত ছিলেন। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভের কয়েক দিন আগে ওই সমাবেশে তিনি ইরানি নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কার্যক্রমের আড়াল হিসেবে আল-মুস্তাফার শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া ইরানি বছরে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় তহবিল হিসেবে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন তোমান পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানকে নিজেদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। তবে কুদস ফোর্সের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল