গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও ফিলিস্তিনিদের হত্যা, আহত হওয়া এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মানবিক, মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের সংগঠন। তাদের ভাষায়, গাজায় যুদ্ধবিরতি এখন ‘নামেই আছে’; বাস্তবে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সেভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফাম, গ্রিনপিস ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংস্থা জানায়, ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনিরা এখনো নিহত ও আহত হচ্ছেন। একই সঙ্গে ত্রাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পুনর্গঠনের উপকরণ প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে পরিবারগুলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না।
সংস্থাগুলোর বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা, গুলিবর্ষণ ও সামরিক অভিযানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২৭ শিশু রয়েছে। এ সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন মানবিক সংস্থার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান নির্বাহী ইনগার অ্যাশিং বলেন, শিশুরা যখন নিহত হতে থাকে এবং পরিবারগুলো যখন জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ পায় না, তখন যুদ্ধবিরতির অর্থ থাকে না। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গড়ে প্রায় প্রতিদিনই একটি শিশু নিহত হয়েছে।
গাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন। শীত ঘনিয়ে আসায় বৃষ্টি, ঠান্ডা ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে বলে উপগ্রহচিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সংস্থাগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে নির্ধারিত প্রত্যাহারসীমা বা ‘ইয়েলো লাইন’ পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা সংকুচিত হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চাপ বেড়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের একটিও পুরোপুরি কার্যকর নেই। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির ঘাটতি গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। নবজাতক, অক্সিজেননির্ভর রোগী, নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন এমন ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী ও গুরুতর আহত মানুষের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাগুলো।
বিবৃতির তথ্যমতে, ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি রোগীর—যাদের মধ্যে অন্তত চার হাজার শিশু—গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসা সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় এক হাজারের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
গাজায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বছরের শেষ পর্যন্ত সংকটজনক পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তা বা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মুখে রয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপদ পানির ঘাটতি, ক্ষতিগ্রস্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলোর দাবি, ত্রাণ প্রবেশের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ সরানোর ভারী যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পুনর্গঠনের উপকরণ প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি। শীতের আগে আশ্রয়, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপও চেয়েছে তারা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে জবাবদিহির প্রশ্ন চাপা পড়ে থাকতে পারে না। তাঁর মতে, গাজার পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যুক্তিও এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মানবিক সংস্থাগুলোর মূল দাবি—যুদ্ধবিরতিকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, অবাধ মানবিক সহায়তা এবং পুনর্গঠনের বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও গাজার পরিস্থিতি নিয়ে এসব অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—চুক্তির লক্ষ্য পূরণে কতটা অগ্রগতি হয়েছে এবং সাধারণ ফিলিস্তিনিরা কবে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
সূত্র: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আল জাজিরা ও গ্লোবাল সেন্টার ফর দ্য রেসপনসিবিলিটি টু প্রোটেক্ট।