যুদ্ধ ও সামরিক হামলায় পরিবেশ ধ্বংসের জন্য আগ্রাসীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন, পরিবেশবিনাশ বা ইকোসাইডকে শুধু পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে আরও বিস্তৃত অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ না করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) তেহরানে ‘ইকোসাইড: নীরব যুদ্ধাপরাধ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন আরাঘচি। তিনি বলেন, পরিবেশ সমগ্র মানবজাতির যৌথ ঐতিহ্য। এটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়, কিংবা স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশের বলি হতে পারে না।
আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, গণহত্যা বা জেনোসাইডের ধারণার সঙ্গে কাঠামোগতভাবে মিল রয়েছে ইকোসাইড শব্দটির। তবে এটি পরিবেশের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ধারণাকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃতিকে হত্যা বা ধ্বংস করার অর্থ বোঝাতে ফারসি ভাষায় এ ধারণার সমার্থক শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাবও দেন তিনি।
যুদ্ধের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়, তা কেবল সংঘাত চলাকালীন সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না বলে উল্লেখ করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, যুদ্ধের আঘাতে পানি, মাটি, বায়ু, বনভূমি, কৃষিজমি, জ্বালানি সম্পদ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষতির প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
পরিবেশ ধ্বংসের উদাহরণ তুলে ধরে আরাঘচি গাজার পরিস্থিতির কথা বলেন। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদনে সেখানে নজিরবিহীন পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কথা উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে জলপাইবাগান ধ্বংস এবং পানি ও মাটির দূষণ। লেবাননের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে অগ্নিকাণ্ডে বনভূমি ও হাজার হাজার জলপাইগাছ ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরেন আরাঘচি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি নিশ্চিত করেছিল যে তেল স্থাপনায় হামলার ফলে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি তেহরানের ওপর ‘কালো বৃষ্টি’র ঘটনাও স্মরণ করেন।
পরিবেশ ধ্বংসের দায় নির্ধারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তিনটি ক্ষেত্রের ওপর গুরুত্ব দেন আরাঘচি। প্রথমত, গুরুতর পরিবেশবিনাশ শনাক্ত করা এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করার সুস্পষ্ট মানদণ্ড তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি নথিবদ্ধ করার জন্য বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তৃতীয়ত, পরিবেশ ধ্বংস প্রতিরোধ, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আক্রান্ত দেশগুলোকে সহায়তা দিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আরাঘচি বলেন, ইকোসাইডকে স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ইরান। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশটির বৈজ্ঞানিক, আইনি ও কূটনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগাতেও প্রস্তুত তেহরান। পরিবেশের ওপর সামরিক হামলার প্রভাব বিশ্বজুড়ে তুলে ধরার জন্য কপ-৩১ সম্মেলনকে উপযুক্ত সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে আরাঘচি বলেন, আগ্রাসীদের তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। তাঁর মতে, যুদ্ধের কারণে পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা প্রয়োজন। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি