সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী বিধিতে সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারে গালিবাফের আপত্তি

ইরানের সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী বিধিমালার একটি অংশকে দেশটির আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করে আপত্তি জানিয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। তাঁর বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার আইনগত ক্ষমতা সরকারের কোনো কর্মীগোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত করা যায় না। এই এখতিয়ার একমাত্র ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হাতে রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সরকারের সংশোধিত বিধিমালার নির্দিষ্ট কিছু ধারার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন গালিবাফ। তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি বিধান, যার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধিনিষেধ আরোপের জন্য ব্যক্তি ও সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারি কর্মীগোষ্ঠীর ভূমিকা বজায় রাখা হয়েছে। এসব বিধিনিষেধের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পদ জব্দ কিংবা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

গালিবাফের মতে, ইরানের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কাকে বা কোন সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের। সরকার নিজস্ব কর্মীগোষ্ঠীর হাতে এই ক্ষমতা তুলে দিয়ে আইন নির্ধারিত এখতিয়ার পরিবর্তন করতে পারে না।

সরকারের সংশোধিত বিধিতেও আপত্তি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধিনিষেধ কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নির্ধারণ করতে ইরানের মন্ত্রিসভা একটি বিধিমালা গ্রহণ করেছিল। ওই বিধিমালায় ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধিনিষেধ আরোপের বিষয় পর্যালোচনার জন্য একটি জাতীয় কর্মীগোষ্ঠী গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়। সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও গোষ্ঠীটির ভূমিকা ছিল।

পরবর্তী সময়ে সরকার বিধিমালাটি সংশোধন করে। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে কর্মীগোষ্ঠীটি গঠিত হবে এবং পরিষদের নির্দেশনায় কাজ করবে। তবে সংশোধনের পরও ওই গোষ্ঠীকে কিছু ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

গালিবাফের আপত্তি হলো, কর্মীগোষ্ঠীটি নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে গঠিত হলেও আইনগতভাবে পরিষদের জন্য সংরক্ষিত ক্ষমতা তার হাতে থাকতে পারে না। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিধিমালার বিতর্কিত অংশটি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিঠিতে সরকারকে নির্ধারিত আইনি সময়সীমার মধ্যে ওই বিধান সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সময়সীমার মধ্যে সংশোধন না করা হলে আইনবিরোধী ঘোষিত অংশটি কার্যকারিতা হারাবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গালিবাফের সিদ্ধান্তটি সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী মূল আইন বাতিল বা পরিবর্তনের বিষয়ে নয়। বরং সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য সরকার যে বিধিমালা তৈরি করেছে, তার একটি অংশে সরকার নিজের এখতিয়ার অতিক্রম করেছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইরানের অবস্থান

ইরানের এই আইনি বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) উদ্বেগ নিরসনের চেষ্টা করছে তেহরান। ২০২০ সাল থেকে ইরান সংস্থাটির উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে।

এফএটিএফের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার অধিকাংশ শর্ত এখনো পূরণ করতে পারেনি ইরান। এ কারণে দেশটির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশকে পাল্টা আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানও জানিয়ে আসছে সংস্থাটি।

এফএটিএফের উদ্বেগের মধ্যে অন্যতম হলো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সন্ত্রাসবাদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্পদ শনাক্ত এবং জব্দ করার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ আইনে কে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কোন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে, সাম্প্রতিক বিরোধটি সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

এফএটিএফের আর্থিক পাল্টা ব্যবস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে আলাদা। তবে উভয় ধরনের বিধিনিষেধই ইরানের ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন করে তোলে।

জাতিসংঘের দুটি সনদে যোগ দিলেও উদ্বেগ কাটেনি

এফএটিএফের উদ্বেগ নিরসনে ইরান গত কয়েক বছরে নিজেদের আর্থিক আইনেও পরিবর্তন এনেছে। ২০১৮ সালে সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক অভ্যন্তরীণ আইন এবং ২০১৯ সালে অর্থপাচারবিরোধী আইন সংশোধন করা হয়।

গত বছর দেশটি জাতিসংঘের দুটি সনদে যোগদানের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করে। এগুলো হলো আন্তদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধবিরোধী পালার্মো সনদ এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন দমনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সনদ দুটি নিয়ে বিতর্ক ছিল।

তবে এসব সনদে যোগ দেওয়া মানেই এফএটিএফের সদস্য হওয়া নয়। এফএটিএফ একটি পৃথক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা কোনো দেশের আইন ও তার প্রয়োগব্যবস্থা সংস্থাটির নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না, তা মূল্যায়ন করে।

ইরান সনদ দুটিতে যোগ দেওয়ার সময় কিছু শর্ত ও সংরক্ষণও রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব সংবিধান ও অভ্যন্তরীণ আইনের কাঠামোর মধ্যে সনদগুলো প্রয়োগের বিষয়টি। সন্ত্রাসে অর্থায়ন দমনবিষয়ক সনদের ক্ষেত্রে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনকে তারা সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করবে, তা নির্ধারণ করবে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।

গত জুনে এফএটিএফ বলেছিল, সনদ দুটির বিষয়ে ইরানের দেওয়া সংরক্ষণগুলো অতিরিক্ত বিস্তৃত এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন বাস্তবায়নের ব্যবস্থাও সংস্থাটির মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ছাড়া মূল কর্মপরিকল্পনার অধিকাংশ শর্ত পূরণে ইরান ব্যর্থ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছিল সংস্থাটি।

ফলে জাতিসংঘের সনদ দুটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এফএটিএফের শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে ইরানের ঘাটতি রয়ে গেছে।

আইনি এখতিয়ার ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য

গালিবাফের আপত্তি মূলত এই জটিলতারই একটি অংশ। একদিকে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন শনাক্ত করা এবং তাদের সম্পদ জব্দ করার কার্যকর ব্যবস্থা দেখাতে চায় ইরান। অন্যদিকে, দেশটির নিজস্ব আইন অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হাতে সংরক্ষিত।

গালিবাফের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারকে এমনভাবে বিধিমালা সংশোধন করতে হবে, যাতে নিরাপত্তা পরিষদের আইনগত এখতিয়ার অক্ষুণ্ন থাকে এবং একই সঙ্গে সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও কার্যকর রাখা যায়। সর্বশেষ এই বিরোধের মধ্য দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক মানদণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জটি আবারও সামনে এসেছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল