ইরানের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও সম্মানজনক চুক্তি করতে হবে, নতুবা নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় কৌশলগত ব্যর্থতার মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটনকে স্থায়ীভাবে আগ্রাসন বন্ধের বিষয়ে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তেহরান কখনোই কোনো বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত করবে না বলে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও কূটনীতির পরিবর্তে সামরিক পদক্ষেপ বেছে নেয়, তাহলে এর পরিণতি হবে আরও বড় কৌশলগত ব্যর্থতা। তার ভাষায়, প্রাচীন ও গর্বিত সভ্যতা হিসেবে ইরান কোনো শক্তির কাছে নতিস্বীকার করবে না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট সমাধানের জন্য আলোচনায় প্রস্তুত রয়েছে, তবে নিজেদের রক্ষার সক্ষমতাও দেশটির রয়েছে।
আরাঘচির অভিযোগ, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণার ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। তার দাবি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় প্রস্তুত নয়, এমন ভুল তথ্য এখনো ট্রাম্পকে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৫ সাল থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা থেকে ইরানের সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চলাকালেও ইরানের ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরে আরাঘচি প্রশ্ন তোলেন, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে আবারও কীভাবে বিশ্বাস করবে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, শান্তির বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের ঘোষিত সদিচ্ছার ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই।
তবে আস্থার সংকট সত্ত্বেও কূটনীতির আরেকটি সুযোগ দিতে ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন আরাঘচি। তার দাবি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ষষ্ঠ দিনে কৌশলগত এই জলপথ খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। আরাঘচির দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলের জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি কিংবা অন্য কোথাও নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে বেসামরিক মানুষের জীবন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নের সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও হোয়াইট হাউস সেই চাপ যথাযথভাবে স্বীকার করছে না। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এবং সামরিক সরঞ্জাম হারানোর ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব উল্লেখ করে আরাঘচি বলেন, বিকল্প কোনো পথই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই জলপথের ভূমিকার পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। বৈধভাবে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য প্রণালিটির নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনে আগ্রহী বলেও জানান তিনি। প্রায় আট মাসের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে দাবি করে আরাঘচি বলেন, নতুন করে সামরিক আগ্রাসন পরিস্থিতির সমাধান আনবে না। সূত্র: প্রেস টিভি