ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধও অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। এদিকে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে কয়েক দিনের সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ বলেন, ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে এনে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় ওয়াশিংটন। তবে সমঝোতা না হলেও কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতো পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন পুনরায় শুরু না হলেও দুই দেশের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ওয়াল্টজের ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মার্কিন নৌবাহিনী ভবিষ্যতের দীর্ঘ সময়জুড়ে ইরানের বন্দর অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। একই সঙ্গে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে সমাধান এবং দেশটির অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে একটি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে মনে করবে না।
নির্বাচনের পর হামলার বিকল্প বিবেচনায় ট্রাম্প
মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে কয়েক দিনের নতুন সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। সাময়িকীটিকে এক বাইরের উপদেষ্টা বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর হচ্ছে এবং অতিরিক্ত সামরিক হামলা দেশটিকে পতনের আরও কাছাকাছি ঠেলে দিতে পারে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক কর্মকর্তা ও আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রথমে আশা করেছিলেন, নির্বাচনের আগেই তেহরান আলোচনায় ফিরবে। কিন্তু তা হয়নি। তবে ৩ নভেম্বরের পর ইরানে আবার হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দ্য আটলান্টিক-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রাখাকেও কিছু কর্মকর্তা ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির নির্বাচনের আগেই ইরানে নতুন দফা হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হামলার অনুমোদন দেননি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের পাল্টাপাল্টি দাবি
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আইওয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর আগের সময়সহ যেকোনো সময়ের তুলনায় গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেশি তেল পরিবহন হয়েছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, অবরোধের ফলে ইরান নিজেদের তেল রপ্তানি করতে পারছে না। একই সঙ্গে তিনি আবারও দাবি করেন, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে।
তবে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর কমান্ডার আলি ওজমাই সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তার বক্তব্য, মার্কিন বাহিনীকে হরমুজ প্রণালি থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তাদের আর কোনো অবস্থান নেই।
ওজমাই বলেন, বর্তমানে মার্কিন বাহিনী পারস্য উপসাগরে নেই; তারা হরমুজ প্রণালি থেকে ৬০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। তার দাবি, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো জায়গা নেই।
দুই পক্ষের এসব পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও প্রবেশাধিকার এখন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে অবরোধ অব্যাহত রাখছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও খোলা রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ চললেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা কাটছে না। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল