ইরানে নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার শঙ্কায় অস্থির মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে, কয়েকটি মার্কিন দূতাবাসে কর্মীসংখ্যা কমানো হচ্ছে এবং তেহরান সম্ভাব্য হামলার জবাবে আঞ্চলিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আবার হামলা চালাবে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কখন হামলা হতে পারে।

তবে নতুন হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন নিশ্চিত ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। সামরিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও পাল্টাপাল্টি হুমকি থেকে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘উত্তেজনা বাড়বে।’ তাঁর মতে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে সংঘাত বাড়ে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর পেছনের উদ্দেশ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াই অনেকটাই কমে আসে। পরে জুনে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও তা পূর্ণাঙ্গ সমাধানের পথ তৈরি করতে পারেনি।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইয়েমেনের হুতিদের ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। মিলারের মতে, এসব বিষয়ে ইরান এমন ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে পারেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটনের জাতিসংঘবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, হোয়াইট হাউস দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।

রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কটও এক সাক্ষাৎকারে ইরানে শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। তবে এগুলো সংশ্লিষ্ট মার্কিন রাজনীতিকদের বক্তব্য; নতুন সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রমাণ নয়।

সম্ভাব্য নতুন হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর।

রয়টার্সের ২৩ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার সামরিক হামলা চালালে উপসাগরের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা নিয়ে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন বলে তাঁরা দাবি করেছেন। কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত বাধাগ্রস্ত করার হুমকির কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।

হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কেবল রয়েছে। এসব কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগ, আর্থিক লেনদেন, ই-কমার্স ও ক্লাউডভিত্তিক সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের তুলনামূলক ছোট অংশ চলাচল করে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। তাই সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে কতগুলো কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিকল্প সংযোগ কতটা কার্যকর থাকে তার ওপর।

ইরানের এসব হুমকির বাস্তবায়ন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে এমন হুমকি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রযুক্তি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোর অজরুরি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও লেবাননে মার্কিন দূতাবাসগুলোর কর্মীসংখ্যা কমানো হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব পদক্ষেপের পেছনে মার্কিন নাগরিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি এবং ইরান-সমর্থিত হুতিদের ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, দূতাবাসে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়নি।

এদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে মার্কিন সহায়তা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। এ পথ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ইরানের তেল রপ্তানি চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রুট ও জাহাজ স্থানান্তরের ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল পরিবহন সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে পরিবহনের ঝুঁকি ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাপ কমেনি।

ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্বালানি ও ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রুয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান জ্বালানি বাজারের ভিন্ন ভিন্ন সূচক পর্যবেক্ষণ করছে। ওয়াশিংটন হরমুজ দিয়ে তেলের পরিমাণ ও সরবরাহ সচল রাখার দিকে নজর দিলেও তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইরানের অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি ও অবরোধের চাপে থাকলেও দেশটির নেতৃত্ব নতুন সংঘাতের ধাক্কা সহ্য করতে পারবে বলে মনে করছে—এমন বিশ্লেষণও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ উভয় পক্ষের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি বাড়াবে।

নতুন সংঘাতের আশঙ্কা শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঘটনাও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলার খবরের পর উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরাকের ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বর্ণিত একটি হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন হামলা চালালে তেহরান শুধু সরাসরি মার্কিন বা ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংঘাতে জড়িত অন্য দেশগুলোর স্থাপনা ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষ কি আবার সামরিক সংঘাতের পথে এগোবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে; অন্যদিকে তেহরান বলছে, নতুন হামলা হলে তার জবাব হবে আরও বিস্তৃত।

বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই ছাড় দিতে অনিচ্ছুক থাকলে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। তবে নতুন হামলা অবশ্যম্ভাবী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।

নতুন সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব ইরান ও ইসরায়েলের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রকাশিত বক্তব্য।