যুদ্ধে জড়াতে চায় না ইরাক, তবু সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তাতে জড়াতে চায় না ইরাক। তবে দেশটির আকাশসীমা দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের চলাচলের খবর, ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান এবং অস্ত্রের গুদামে সন্দেহজনক হামলার ঘটনা বাগদাদের নিরপেক্ষ থাকার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, তাঁর দেশ কোনো যুদ্ধে অংশ নেবে না। একই সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে বাগদাদ।

শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আল-ইরাকিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাইদি বলেন, ইরাক কোনো যুদ্ধে অংশ নেবে না। তাঁর ভাষ্য, আঞ্চলিক বিরোধের সমাধানে ইরাক একটি মিলনস্থল হিসেবে ভূমিকা রাখতে চায়।

কিন্তু দেশটির ভেতরে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান সরকারের এই নীতিকে জটিল করে তুলেছে। শনিবার ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামের ইরানপন্থী কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট তেহরানের পাশে দাঁড়ানোকে নৈতিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছে। তবে বিবৃতিতে নতুন করে হামলা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

এতে স্পষ্ট হয়েছে, ইরাক সরকার সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইলেও দেশটির সব সশস্ত্র পক্ষ একই অবস্থানে নেই।

ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের তৎপরতার খবর ইরাকের আকাশসীমাকে সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের দিকে উড়ে যাওয়ার পর ফিরে আসে। বিমানগুলো সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এই তৎপরতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইরানের কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নবাভিয়ান এ ঘটনায় ইরাক সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাকে উড়াল দিয়ে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাগদাদ ব্যবস্থা না নিলে ইরাকি জনগণ, ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠী এবং ইরানের জনগণ নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

অন্যদিকে, ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ দাবি করেছে, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে ইরাকের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ১৭১টি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। জোটটির অভিযোগ, জর্ডান ও তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরাকের বিভিন্ন প্রদেশের ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ চালানো হয়েছে।

জোটটি আরও দাবি করেছে, শুক্রবার তারা গোয়েন্দা ড্রোনসহ ১৭টি উড়োজাহাজ শনাক্ত করেছে। এসব সংখ্যা ও অভিযোগ সশস্ত্র গোষ্ঠীটির নিজস্ব বক্তব্য; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে এগুলো প্রতিষ্ঠিত নয়।

আকাশসীমা নিয়ে এই বিরোধ ইরাক সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, বিদেশি সামরিক তৎপরতা ঠেকাতে ব্যর্থ হলে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

ইরাকে অস্ত্রের গুদামে হামলার অভিযোগও নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। আশার্ক আল-আওসাতের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইরান থেকে ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছে পাঠানো চীনা তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংরক্ষিত ছিল—এমন দুটি স্থাপনায় ইসরায়েল হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।

সূত্রগুলোর দাবি, বড় একটি চালান স্থাপনাগুলোতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই ধ্বংস হয়ে যায়। তবে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করার বিষয়ে কোনো স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। গুদামগুলোতে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ছিল, সে বিষয়টিও নিশ্চিত নয়।

এর আগে ১৭ অক্টোবর পূর্ব বাগদাদের একটি গোলাবারুদ সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরণের কথা জানিয়েছিল ইরানপন্থী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)। প্রাথমিকভাবে তারা ঘটনাটিকে অভ্যন্তরীণ ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করে। ওই ঘটনায় পাঁচজন আহত হন।

ইরাকের এক রাজনৈতিক উপদেষ্টার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সংঘাত শুরু করার পাশাপাশি ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সরবরাহব্যবস্থাকে গোপনে লক্ষ্যবস্তু করছে কি না।

অভিযোগগুলো নিশ্চিত হলে ইরাকের ভূখণ্ডে সরাসরি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে। তবে এ মুহূর্তে হামলার দায় ও উদ্দেশ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।


প্রধানমন্ত্রী জাইদি ইরাকের সব অস্ত্র ও সামরিক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা কি সশস্ত্র গোষ্ঠীসহ একটি রাষ্ট্র, নাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অধীনে একটি রাষ্ট্র?’

জাইদি জানিয়েছেন, পাঁচটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে তাঁর সরকার। এর মধ্যে তিনটির সঙ্গে ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে এবং আরও দুটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। অন্য দুটি গোষ্ঠীর সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো অস্ত্র থাকবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী।

তবে এই প্রক্রিয়া কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। রুদাওয়ের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতায়েব হিজবুল্লাহ অস্ত্র নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করেছে। গোষ্ঠীটি জাইদির বিরুদ্ধে তাদের প্রস্তাবিত চুক্তির জবাব না দেওয়ার অভিযোগও তোলে।

অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বিরোধ ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে গভীর যোগসূত্র তুলে ধরছে।

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলও সংঘাতের ঝুঁকির বাইরে নেই। শনিবার এরবিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন একটি শিবিরে আঘাত হানে বলে নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।

ইরানি কুর্দি বিরোধী দল কুর্দিস্তান কোমালা পার্টি জানিয়েছে, আলানা উপত্যকায় তাদের একটি ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। এতে স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হননি বলে দলটি দাবি করেছে। তবে ড্রোনটি কারা পাঠিয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। তেহরানের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী ইরানের ভেতরে হামলা সংগঠিত করে এবং অস্থিরতা উসকে দেয়।

২০২৩ সালে ইরাক ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এর আওতায় ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা এবং ইরান সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়েও কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলে মার্চে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই আলোচনায় সিআইএর ভূমিকা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

মার্চের ৫ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে কুর্দি যোদ্ধাদের প্রবেশের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানালেও দুই দিন পর তিনি বলেন, কুর্দিদের তিনি যুদ্ধে জড়াতে চান না। তাঁর বক্তব্য ছিল, চলমান যুদ্ধের মধ্যে কুর্দিদের যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ইরাকের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। একদিকে সরকার যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতে সরাসরি জড়ানো এড়াতে চায়; অন্যদিকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান, বিদেশি বিমান চলাচলের অভিযোগ এবং সন্দেহজনক হামলার ঘটনা দেশটির ভূখণ্ডকে সংঘাতের সম্ভাব্য ময়দানে পরিণত করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। প্রধানমন্ত্রী জাইদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ইরাকের ক্ষতি করেছে। ইরানের সঙ্গে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জনসম্পর্কের কারণে ইরাকি জাহাজ চলাচলে ছাড় পাওয়া যাবে বলে তাঁর সরকার আশা করেছিল।

একই সঙ্গে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। জাইদির ভাষ্য, কয়েকটি পক্ষ মনে করে, এসব দেশের ওপর হামলার উৎস ছিল ইরাকের ভূখণ্ড।