ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে পিছিয়ে পড়লেও দ্বিতীয় দফায় ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ৮০ বছর বয়সী লুলা। তবে তার এই ঐতিহাসিক জয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো নিয়ে বিভ্রান্তি, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং ফল বাতিলের আইনি চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা। একই সঙ্গে লুলার জয় লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার জন্যও নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে।
নজিরবিহীন প্রত্যাবর্তনে ইতিহাস গড়লেন লুলা
নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও লুলার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ২২ লাখ।
প্রথম দফার পরের সময়টুকুতে লুলা ঘরে বসে থাকা ভোটারদের কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট এবং তার সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভবিষ্যৎকে প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
রোববারের (২৫ অক্টোবর) ভোট গণনার শুরুতে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। একপর্যায়ে এগিয়ে যান বলসোনারো। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফল আসতে শুরু করলে ব্যবধান পাল্টে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেন লুলা। অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই লুলা ও তার ওয়ার্কার্স পার্টির শক্তিশালী ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত।
লুলার এই জয় ব্রাজিলের আধুনিক নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল ঘটনা। প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থেকেও দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হওয়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার রেকর্ডও গড়তে পারেন লুলা।
ভোটের সময় বাড়ানো নিয়ে বিভ্রান্তি
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। লুলার শিবির অভিযোগ করে, কয়েকটি শহরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গণপরিবহন কমিয়ে দেওয়ায় নিম্ন আয়ের ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভোটারদের সুবিধার্থে সময় বাড়ানোর আবেদন জানায় বলসোনারোর প্রচারশিবির।
মিনাস জেরাইসের আঞ্চলিক নির্বাচনী আদালত জানায়, সেখানে ৩৪৯টি ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে ব্যাকআপ ব্যাটারির সাহায্যে ভোটের যন্ত্রগুলো সচল ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ব্রাসিলিয়া সময় বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই পক্ষের আবেদনের পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোট গ্রহণ আরও দুই ঘণ্টা চালানোর নির্দেশ দেন। ফলে সময়সীমা সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
তবে সিদ্ধান্তটি আসার আগেই বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে জানিন স্পষ্ট করেন, যেসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে, সেগুলো আর খোলা হবে না; শুধু চালু থাকা কেন্দ্রগুলোতেই বাড়তি সময় ভোট দেওয়া যাবে। এতে কিছু ভোটার বিভ্রান্ত হন এবং সময় বাড়ানোর ঘোষণার পরও কেউ কেউ ভোট দিতে না পেরে ফিরে যান।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ফল বাতিলের হুমকি
ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ফল ঘোষণার পর তিনি ভোট বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। বিচারপতি জানিনের বিরুদ্ধেও বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এদিকে, পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ তদন্ত করছে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ। সালভাদরে বাস চলাচল কমানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শহরটির পরিবহনবিষয়ক সচিবকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে একটি আদালত। লুলার শিবির এসব ঘটনাকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করা হলে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। দেশটির বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজনও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রও ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে বলসোনারো পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তাদের অভিযোগের প্রতিধ্বনি করেছে।
বেশি ভোটার উপস্থিতি কি লুলাকে এগিয়ে দিল?
লুলার জয়ের পেছনে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধির ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন জরিপকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাসইনটেলের প্রধান আন্দ্রেই রোমান। তার মতে, প্রথম দফার তুলনায় ভোট না দেওয়া মানুষের সংখ্যা কমে আসা লুলার জয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।
৪ অক্টোবরের প্রথম দফার নির্বাচনে আনুমানিক ৩ কোটি ৩৪ লাখ ব্রাজিলীয় ভোট দিতে যাননি। দেশটিতে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সেদিন ভোটারদের প্রায় ২১ শতাংশ অনুপস্থিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের পর কোনো সাধারণ নির্বাচনে এটি ছিল সর্বোচ্চ ভোটদানে অনুপস্থিতির হার।
দ্বিতীয় দফায় এই ভোটারদের কতজন কেন্দ্রে ফিরেছেন এবং তাঁদের ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে গেছে, তা লুলার প্রত্যাবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দুই প্রার্থীর শক্তিশালী অঞ্চলগুলোতে ভোটার উপস্থিতির চূড়ান্ত হিসাব নির্বাচনের ফল ব্যাখ্যায় সহায়তা করতে পারে।
প্রচারের শেষ পর্যায়ে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের ভোটারদের আকৃষ্ট করতেও উদ্যোগী হন লুলা। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রতিশ্রুতিও ছিল।
লুলার জয়ে জটিলতায় ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকা পরিকল্পনা
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনী সাফল্যের মধ্যে লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বলসোনারো পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সমর্থন পেয়ে আসছে। বিপরীতে, লুলা তার নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা চাপ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে এই উদ্যোগকে লুলাকে দুর্বল করা এবং বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় ফেরানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ট্রাম্প নিজে নির্বাচনে কাকে জয়ী দেখতে চান, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে চাননি। রোববার (২৫ অক্টোবর) সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না, তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
অন্যদিকে, লুলা তার প্রচারে ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং জইর বলসোনারোর বিচার নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও তার সরকারের বিরোধ রয়েছে।
বিজয় ভাষণে লুলা বলেন, চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পথে তাঁকে বিদেশ থেকে আসা হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি এই নির্বাচনকে মিথ্যা ও অস্বীকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্যে গণতন্ত্রের পক্ষে সমর্থকদের ভূমিকার প্রশংসাও উঠে আসে।
সব মিলিয়ে, লুলার চতুর্থ মেয়াদের জয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ভোটের সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক, সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জ এবং বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন নতুন মেয়াদের শুরুতেই লুলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। সূত্র: আলজাজিরা