ইয়েমেনে হুথি শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠছে একটি প্রজন্ম। তাদের অনেকের শৈশব কাটছে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, শিশুদের একটি অংশকে স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নিয়োগ করা হচ্ছে। এতে দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরায় ৬ নভেম্বর প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে লেখক আলখাদার সুলাইমান এসব উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। তাঁর নিবন্ধে জাতিসংঘের অনুসন্ধান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্কুল ও গ্রীষ্মকালীন শিবিরকে মতাদর্শিক প্রচার এবং সামরিক প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের বহু শিশুর নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, নিরাপত্তাহীনতা ও দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও সংকুচিত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, শিশুদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। অথচ ২০২২ সালে শিশু নিয়োগ বন্ধে জাতিসংঘের সঙ্গে একটি কর্মপরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিল হুথিরা।
এ ধরনের প্রতিশ্রুতির পরও শিশুদের নিয়োগ বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শিশুদের সামরিক কাজে যুক্ত করা শুধু তাদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়; যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক পুনর্বাসনেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব শুধু হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। এডেন, হাদরামাউত ও শাবওয়ায় বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলা এবং সৌদি আরবে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাগুলো বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ফলে ইয়েমেনের সংঘাত এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
লেখক মনে করেন, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করতে অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থায়নের উৎসের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে শুধু সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য শিক্ষা পুনরুদ্ধার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ পাওয়া শিশুদের সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা জরুরি। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা শিশুদের শুধু মুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য শিক্ষা, পরিবার ও সমাজের সহায়তা নিশ্চিত করতে হয়।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি শিশুদের নিয়োগ বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তা না হলে সংঘাতের ক্ষতি বর্তমান প্রজন্মের পরবর্তী জীবনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।