পরমাণু অস্ত্র কারখানাকে ৬০ বছর ধরে ‘টেক্সটাইল’ বলে পরিচয় দিয়েছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে প্রায় ছয় দশকের গোপনীয়তা ও কৌশলগত অস্পষ্টতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করার নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। দেশটি কখনো প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়ার ঘোষণা দেয়নি।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনাকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির সূতিকাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

‘টেক্সটাইল কারখানা’ বলে পরিচয় দিয়েছিল ইসরায়েল

১৯৬০ সালের শুরুর দিকে কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিক ইসরায়েলের একটি হেলিকপ্টারে করে ভ্রমণের সময় মৃত সাগরের প্রায় ২০ মাইল পশ্চিমে নেগেভ মরুভূমিতে একটি নির্মাণাধীন স্থাপনা দেখতে পান। তাঁরা ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অ্যাডি কোহেনের কাছে স্থাপনাটি সম্পর্কে জানতে চান।

জবাবে কোহেন সেটিকে ‘টেক্সটাইল কারখানা’ বলে পরিচয় দেন। পরে মার্কিন গোয়েন্দারা স্থাপনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ওগডেন রিড এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান।

ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে সংরক্ষিত একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তার উদ্ধৃতি দিয়ে সিএনএন জানায়, কোহেন বিষয়টি প্রথমে হাস্যরসের সঙ্গে নিলেও তাঁর আচরণে বোঝা গিয়েছিল, তিনি বিশ্বাস করেন—একসময় ওই চুল্লি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।

পরবর্তী সময়ে ‘টেক্সটাইল কারখানা’ কথাটি ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রচলিত এক ধরনের কৌতুকপূর্ণ সংকেতে পরিণত হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউরেনিয়াম নিখোঁজের ঘটনা

১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ইউরেনিয়াম স্থাপনায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কয়েক শ পাউন্ডের ঘাটতি ধরা পড়ে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একাংশের ধারণা ছিল, ওই ইউরেনিয়াম ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক একটি প্রামাণ্যচিত্রেও এ সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

তবে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত প্রমাণিত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নীরব ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের আশঙ্কা ছিল, ইসরায়েল প্রকাশ্যে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে আরব দেশগুলোও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা জোরদার করতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার ঝুঁকি ছিল।

১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করতেন, ইসরায়েলকে পুরোপুরি থামানো কঠিন। অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে, আবার প্রকাশ্যে কর্মসূচিটি তুলে ধরলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

 

১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হয়ে ওঠা ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে নিক্সন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইরের মধ্যে হোয়াইট হাউসে একান্ত বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের লিখিত বিবরণ পাওয়া না গেলেও পরবর্তী এক স্মারকলিপিতে কিসিঞ্জার উল্লেখ করেন, নিক্সনের প্রধান উদ্বেগ ছিল—ইসরায়েল যেন প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকার ঘোষণা না করে এবং পারমাণবিক পরীক্ষা না চালায়।

এরপর ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য চাপ কার্যত কমে যায়।

১৯৮৬ সালে গোপন কর্মসূচির তথ্য প্রকাশ

১৯৮৬ সালে দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনার সাবেক কর্মী মরদেকাই ভানুনু ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও স্থাপনার গোপনে তোলা ছবি ব্রিটিশ সংবাদপত্র সানডে টাইমসের কাছে দেন। ওই প্রকাশনার পর ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্দেহ আরও কমে যায়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভানুনুকে রোমে নিয়ে গিয়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আটক করে এবং পরে গোপনে ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেয়। এ ঘটনার বিবরণ ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক পিটার হুনামের একটি বইয়ে উঠে এসেছে।

 

নতুন করে কেন আলোচনায় ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র

বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে। একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কংগ্রেসের বিবেচনায় রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক সক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো মনে করেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অস্পষ্ট নীতি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েলের সঙ্গে একই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমারেখা এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

গত জুনে কংগ্রেসের এক শুনানিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন কাস্ত্রো। জবাবে রুবিও বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মনে করে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যদিও দেশটি কখনো প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি। যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করে না।

 

অন্যদিকে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পারমাণবিক কৌশলবিদ ম্যাথিউ ক্রোনিগ সতর্ক করেছেন, ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর মধ্যেও একই ধরনের অস্ত্র অর্জনের চাপ বাড়তে পারে। এতে আঞ্চলিক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সমর্থন নিয়েও দেশটির অভ্যন্তরে প্রশ্ন বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, বছরের শেষ দিকে ইসরায়েলকে দেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর যুক্তি, ইসরায়েলের এখন আর ওই সহায়তার প্রয়োজন নেই।

তবে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেছেন, নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা ও অবস্থানসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করার নীতি দীর্ঘদিনের।

সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দিমোনা স্থাপনার নিচে প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত একটি গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কথা ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি হিব্রু ভাষার প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আগমনের আগে স্থাপনাটির লিফটের প্রবেশপথ দেয়াল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো।

 

ইসরায়েল কখনো পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়ার ঘোষণা দেয়নি এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতেও স্বাক্ষর করেনি। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সংঘাত, অন্যদিকে ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি হতে পারে।