মূল্যস্ফীতিতে ইরান যুদ্ধের উত্তাপ মার্কিন জনজীবনে

সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি আছড়ে পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে। দীর্ঘ তিন বছর পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে মূল্যস্ফীতির গতি। মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএলএস) প্রকাশিত কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) বা ভোক্তা মূল্য সূচকের তথ্যে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৮ শতাংশে, যা ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ।

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে, তখন দেশটির মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ২.৪ শতাংশ। যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দ্রুত বাড়তে থাকে তেলের দাম। এর প্রভাবে সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পেট্রোল পাম্প থেকে শুরু করে মুদি দোকান সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাং-ওন সন বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন 'অস্বস্তিকর' হিসেবে। তাঁর মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ফেডারেল রিজার্ভের পক্ষে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে গড় বেতন বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর এবারই প্রথম মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর মার্কিন নাগরিকদের প্রকৃত আয় কমেছে। পিএনসি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ অগাস্টিন ফশে মনে করেন, ভোক্তারা আগে থেকেই চাপে ছিলেন, এখন শ্রমবাজারেও সেই দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। এপ্রিল মাসে সামগ্রিকভাবে খাবারের দাম ০.৫ শতাংশ এবং মুদিপণ্যের দাম ০.৭ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে গরুর মাংস, ফল ও সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজেলচালিত রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাজা ফল ও সবজির দাম এপ্রিল মাসে ২.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ। টমেটোর দাম টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আরএসএম ইউএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস বলছেন, যুদ্ধ এখন আমেরিকার ঘরে পৌঁছে গেছে, যার প্রমাণ মিলছে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে।

এপ্রিল মাসের মোট মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪০ শতাংশেরই কারণ ছিল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। মার্চ মাসে গ্যাসের দাম রেকর্ড ২১.২ শতাংশ বাড়ার পর এপ্রিলেও তা ৫.৪ শতাংশ বেড়েছে। তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের বিলে পড়েছে বড় প্রভাব; এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২.১ শতাংশ। এর পাশাপাশি আবাসন খাতের মূল্যস্ফীতি ০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ।

মূল্যস্ফীতির এই উর্ধ্বগতি মার্কিন রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিএনএনের জরিপ অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর বড় প্রভাব পড়বে। তবে ট্রাম্প বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, ইরানের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন নাগরিকদের এই 'সামান্য মূল্য' দিতে হবে এবং যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম কমে আসবে।

বর্তমানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এর মধ্যেই দেশটিতে শিক্ষাঋণ খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ কেবল সামরিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন মার্কিন অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে গভীর সংকট তৈরি করেছে। সূত্র: এপি নিউজ