ইরান যুদ্ধে ফুরিয়েছে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ১৯ বছরের মজুত

ইরানের সঙ্গে সাত মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে যুদ্ধের আগে মজুত থাকা অস্ত্রের পরিমাণে ফিরতে ওয়াশিংটনের অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে বলে এক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব শুধু চলমান সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও কয়েক বছর ধরে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ওপর এর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগের বিষয় কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হয়েছে, তা নয়। ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো পুনরায় তৈরি করে মজুত পূরণ করতে কত সময় লাগবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া এবং সেই ঘাটতি পূরণে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ায় নতুন কোনো সংঘাত তৈরি হলে এই সীমাবদ্ধতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়নবিষয়ক কেন্দ্রের নামে প্রচারিত এক প্রতিবেদনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সাত মাসের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা এই প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ১৯ বছরের ক্রয়ের সমপরিমাণ। একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর লাগতে পারে। এই হিসাব তীব্র সংঘাতে অস্ত্র ব্যবহারের গতি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদনক্ষমতার মধ্যে ব্যবধানকে তুলে ধরে।

মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়টের গুরুত্ব

প্যাট্রিয়ট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি। নির্দিষ্ট ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এর প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সামরিক বাহিনী, ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।

যুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার মার্কিন সামরিক নেতৃত্বকে অস্ত্রের বরাদ্দ নিয়ে আরও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলতে পারে। কোন স্থাপনার প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোন লক্ষ্যবস্তুতে কতটা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়োজিত রাখা হবে এবং কতটা ঝুঁকি গ্রহণ করা হবে, এসব প্রশ্নের গুরুত্ব বাড়তে পারে। অর্থাৎ, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাতে থাকলেই সব ক্ষেত্রে একই মাত্রায় সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থাকাও জরুরি।

তবে কমে যাওয়া মজুত পূরণ করা শুধু সরকারি ক্রয়াদেশ বাড়ানোর বিষয় নয়। উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত শিল্প সক্ষমতা প্রয়োজন। উৎপাদন লাইন গড়ে তোলা কিংবা বিদ্যমান উৎপাদন বাড়িয়ে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ফলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলেই উৎপাদন একই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব হয় না।

এ কারণেই সংঘাতের তীব্রতা কমে এলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বাহিনীর চাহিদা পূরণ, ইউরোপে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অঙ্গীকার বজায় রাখা এবং পূর্ব এশিয়ায় সম্ভাব্য সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকা, সবকিছুই একই সঙ্গে সামলাতে হবে ওয়াশিংটনকে। অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে যত বেশি সময় লাগবে, এসব দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও তত কঠিন হতে পারে।

চীনের জন্য কি তৈরি হতে পারে কৌশলগত সুযোগ?

মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রভাব চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সম্ভাব্য কোনো সংঘাত তৈরি হলে সেখানে নির্ভুল আঘাত হানার অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রয়োজন হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক চাহিদা পূরণ করতে হবে, অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ায় সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিও ধরে রাখতে হবে। ফলে কোন অঞ্চলে কত অস্ত্র বরাদ্দ করা হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনকে আরও সতর্কভাবে হিসাব করতে হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা এ ধরনের পরিস্থিতিকে কখনো কখনো দুর্বলতার সুযোগকাল হিসেবে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ, ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি, অথচ অন্যান্য অঞ্চলে নিরাপত্তার চাহিদা ও সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি রয়ে গেছে। এই সময়টিতে প্রতিপক্ষের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

তবে এমন পরিস্থিতি থেকে চীনের নিশ্চিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ রক্ষায় অক্ষম হয়ে পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির একমাত্র ভিত্তি নয়। দেশটির নৌবহর, বিমানবাহিনী, বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও রয়েছে। তা সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে অস্ত্রের মজুত কতটা গভীর এবং ব্যবহৃত অস্ত্র কত দ্রুত প্রতিস্থাপন করা যায়, তা প্রযুক্তি ও অস্ত্রের গুণগত মানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পড়তে পারে প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু দেশটির নিজস্ব সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল মিত্রদেশগুলোও সরবরাহে বিলম্বের মুখে পড়তে পারে। চাহিদা বেড়ে গেলে আগে দেওয়া ক্রয়াদেশ অনুযায়ী অস্ত্র সরবরাহ করতেও বেশি সময় লাগতে পারে।

এ অবস্থায় মার্কিন সরকারকে নিজেদের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন এবং নিরাপত্তা সহযোগীদের চাহিদার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হতে পারে। কোন পক্ষের কাছে আগে অস্ত্র পৌঁছাবে, তা নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক এবং তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের জন্যও বিষয়টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি দেখায় যে কোনো সামরিক সংঘাতের মূল্যায়ন শুধু দুই পক্ষের অস্ত্রের সংখ্যা কিংবা গোলাবারুদের শক্তি দিয়ে করা যায় না। চাপ সহ্য করার ক্ষমতা, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবহৃত অস্ত্র পুনরায় তৈরি করার ব্যয়ও সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়াকেই দেশটির সামরিক পরাজয়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষের অর্জন, সামরিক অভিযানের ফলাফল এবং ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কতটা পূরণ হয়েছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগার সম্ভাবনা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বাধীনতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান থেমে গেলেও অস্ত্রের মজুত ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর তার প্রভাব কয়েক বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রকৃত মূল্য শুধু যুদ্ধ চলাকালে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তার প্রভাব সামাল দিতে হয়। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি