ইউক্রেনকে সামরিকভাবে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার দাবি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর করতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক, একে আর বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মুরাতভ রাশিয়ার স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নোভায়া গাজেতার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক। তার ভাষায়, ইউক্রেনকে দখল করা সম্ভব নয়, বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশটিকে ধ্বংস করা সম্ভব, এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মুরাতভ বলেন, দুই প্রতিবেশী ও ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ স্লাভ জাতির মধ্যে যুদ্ধে যদি ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটিকে কোনোভাবেই বিজয় বলা যায় না। তার মতে, ইউক্রেনকে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও জয় করা সম্ভব নয়।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মুরাতভ জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে রাশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ৫০০ বারের বেশি আলোচনা বা উল্লেখ তিনি লক্ষ্য করেছেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের মতো সরকারি আয়োজনে এ ধরনের বক্তব্য তাকে উদ্বিগ্ন করেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর সময় পুতিন রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন উল্লেখ করে মুরাতভ প্রশ্ন তোলেন, এখন সেই নিরাপত্তা কতটা বেড়েছে। তার মতে, রাশিয়ায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা, জ্বালানি সংকট, মোবাইল ইন্টারনেটের বিঘ্ন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে তাকালে নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মুরাতভের মতে, অভ্যন্তরীণভাবে পুতিন এখনো শক্তভাবে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। অভিজাতদের মধ্যে বিভাজন বা গোপন ষড়যন্ত্রের নানা আলোচনা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, দেশটি এখনো পুতিনের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হচ্ছে এবং তার ক্ষমতার পেছনে ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস বা এফএসবির ভয়ভীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর দমন-পীড়নের চিত্রও তুলে ধরেন তিনি। মুরাতভ বলেন, শত শত মতপ্রকাশকারীকে বিদেশি এজেন্ট, উগ্রপন্থি বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাষ্ট্রীয় নীতির বিরোধিতা করার কারণে অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ কারাগারে রয়েছেন।
নিজের সংবাদপত্র নোভায়া গাজেতার পরিস্থিতিও তুলে ধরেন মুরাতভ। তার দাবি, পুতিনের একটি ডিক্রির পর পত্রিকাটির ছাপাখানা জাতীয়করণ করা হয় এবং পরে এর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। অনলাইন সংস্করণ থাকলেও রাশিয়ায় সেটিতে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মুরাতভ নিজেও রাশিয়ায় বিদেশি এজেন্ট হিসেবে তালিকাভুক্ত। তবে নিজের ওপর চাপের চেয়ে কারাগারে থাকা সহকর্মী ও যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিদের পরিস্থিতিই তাকে বেশি উদ্বিগ্ন করে বলে জানান তিনি।
তার কথায়, মস্কোর রাস্তায় এখনো অনেকে তার ও তার সহকর্মীদের সমর্থন করেন। তবে সেই সমর্থন প্রকাশ্যে নয়, মানুষ ফিসফিস করে কৃতজ্ঞতা জানায়। সূত্র: বিবিসি