ফ্রান্সে বিক্ষোভে শিক্ষার্থীর হাত বিচ্ছিন্ন, স্টান গ্রেনেড ব্যবহার স্থগিত

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেড সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে ফ্রান্স। চলমান বিক্ষোভের মধ্যে সোমবার (৫ অক্টোবর) উত্তরাঞ্চলীয় লঁস শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ন্যুনেজ জানিয়েছেন, লঁসের ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত রাখতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে বিক্ষোভকারী ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

লঁস শহরের অগুস্ত বেজাল উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে ওই কিশোর গুরুতর আহত হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, সে একটি গ্রেনেড কুড়িয়ে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশের এক সদস্য গ্রেনেড ছোড়ার পর সেটি সরাসরি ওই কিশোরকে আঘাত করে।

স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে যখন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীর একটি দল পুলিশের মুখোমুখি হয়ে পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করছিল। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে তদন্ত চলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যুনেজ বলেন, পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তদন্ত হওয়াই স্বাভাবিক। পুলিশি তদারকি সংস্থা আইজিপিএন বিক্ষোভের সময় পুলিশের বলপ্রয়োগ মাত্রাতিরিক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ১৮টি তদন্ত শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

স্টান গ্রেনেডকে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিস্ফোরণের সময় এটি ছোট রাবারের গুলি ছুড়ে দেয়। পুলিশ ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা অবশ্য গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, ভিড় ছত্রভঙ্গ করার ওই অস্ত্র না থাকলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের কাছাকাছি সংঘর্ষ এবং আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এর আগে গত সপ্তাহে প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমের সাঁত-ওয়াঁ-লোমোন শহরে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের মুখে কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড আঘাত করে। তার আইনজীবীর দাবি, ওই ঘটনায় কিশোরটির কয়েকটি দাঁত পড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। এ ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

এদিকে বুধবার স্ত্রাসবুর্গের একটি বিদ্যালয়ের বাইরে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছে। স্থানীয় প্রসিকিউটরদের মতে, আতশবাজির একটি গোলা হাতে নেওয়ার সময় ওই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বেলফোর শহরে ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তার মাথা পানির নিচে চেপে ধরেছিলেন, এমন অভিযোগের ভিত্তিতেও হত্যাচেষ্টার তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেও পুলিশ কর্মকর্তাকে হামলার অভিযোগে গুরুতর হামলার মামলা হয়েছে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ বুধবারও অব্যাহত ছিল। দেশজুড়ে ৫০০টির বেশি বিদ্যালয় পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জাতীয় পরিষদে জানিয়েছেন, ২৪টি বিদ্যালয় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হওয়ায় কয়েক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হবে। এতে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের দাবিতে আয়োজিত এসব বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই দিন ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৪৩ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হন।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের অংশগ্রহণে বড় আকার ধারণ করেছে। এ সময় ৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে ২১৫ জন শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবারের বিক্ষোভে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উচ্চবিদ্যালয় কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জরুরি বৈঠক করেন। সরকারি হিসাবে মঙ্গলবারের বিক্ষোভে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয়। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার।

বিক্ষোভকারীরা বৃহস্পতিবার প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে চতুর্থ দফায় আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বিক্ষোভের সময় সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিকভাবেও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোওমকে নির্বাচনের আগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন। দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর দলের পক্ষ থেকে পুলিশি গ্রেনেড ব্যবহারের সমালোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ডানপন্থী জাতীয় সমাবেশের নেতা মেরিন ল্য পেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ সবসময় পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বলে অভিযোগ করেছেন।

উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি ইউনিয়নের নেতা রিয়াদ রানি বুধবার পুলিশকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, পুলিশকে শান্ত রাখতে হবে এবং সংযমের আহ্বান জানাতে হবে। সূত্র: বিবিসি