জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট এবং ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপ। ফ্রান্স থেকে শুরু করে গ্রিস, পর্তুগাল, ইতালি, স্পেন, আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে তীব্র জনবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। এদিকে ফ্রান্সের আদলে ৩১ অক্টোবর বার্লিন, কোলন, হামবুর্গ, মিউনিখসহ ২১টি শহরে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘জেন জি রেজেল্ট’ নামের একটি যুব সংগঠন।
গত সপ্তাহের সহিংসতা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না পারা ফরাসি সরকার আগামী শনিবারের নতুন বিক্ষোভ মোকাবিলায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে। সহিংসতার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার রাজধানী প্যারিসের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস, ল্যুভর মিউজিয়াম ও শঁজেলিজের আশপাশের এলাকায় সব ধরনের বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ।
তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ আটকে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্রাসাদে শীর্ষ গোয়েন্দা ও মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়িয়ে এবং ‘সঁতিনেল’ ফোর্সের সেনা ও বিশেষ এলিট বাহিনী নামানোর ঘোষণা দিয়ে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মাতিনিয়োঁতে রাজনৈতিক দল ও প্রধান শহরগুলোর মেয়রদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু।
গত বুধবার গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্সসহ প্রায় ৫০টি শহরে হাজার হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে এ আন্দোলন হয়। অনেক বিক্ষোভকারী ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এদিকে আগামী ৩১ অক্টোবর বার্লিন, কোলন, হামবুর্গ ও মিউনিখসহ ২১টি শহরে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘জেন জি রেজেল্ট’ নামের একটি যুব সংগঠন। জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, বাজেট ছাঁটাই, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিবাদে হাজার হাজার তরুণ এই বিক্ষোভে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ওয়েবসাইটে সহিংসতার সম্পূর্ণ বিরোধিতার কথা বলা হলেও, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের সহিংসতা দেখে জার্মান পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জার্মান ফেডারেল পুলিশের জিডিপি ইউনিয়নের প্রধান আন্দ্রেয়াস রসকপফ জানিয়েছেন, উগ্রপন্থিরা সাধারণদের ভিড়ে মিশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেবে।
পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তোয় আবাসন সংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। পুলিশ তাঁবুগুলো সরিয়ে দিয়ে ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও আন্দোলন থামেনি। স্পেনের মাদ্রিদেও প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলছে বিক্ষোভ, যার জেরে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এ ছাড়া ইতালি ও আলবেনিয়াতেও স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
ফরাসি সরকার এই অস্থিরতার জন্য উগ্র-বামপন্থি চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করলেও, বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীরা সরকারের দমনপীড়নকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। মাতিনিয়োঁতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের ওপর অনাস্থা জানিয়ে চরম ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার্দ ফিলিপের মতো বড় নেতারা বৈঠক বয়কট করেছেন। অন্যদিকে এলএফআই নেতা জঁ-লুক মেলাঁশঁর প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে জবাবদিহি ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি প্যারিস, লিঁও ও মার্সেইয়ের মেয়ররা এক যৌথ কলামে অভিযোগ করেন, সহিংসতায় তাদের শহরগুলোর বিশাল অংশকে সুরক্ষাহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। তারা পুলিশি কৌশলের তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন এবং ক্ষতিপূরণ মেরামতের জন্য বিশেষ জাতীয় সংহতি তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।