ভারত মহাসাগরের নতুন ‘হরমুজ’: মোদীর বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প

ভারতীয় মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে, ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশির বুকে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা এক টুকরো দ্বীপ এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভারতের দক্ষিণতম বিন্দু, গ্রেট নিকোবার দ্বীপটি ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দিল্লির চেয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের অনেক বেশি কাছাকাছি। প্রায় চার দশক ধরে এই অঞ্চলটি এক প্রকার উপেক্ষিতই ছিল।

১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হংকং-এর সমান আয়তনের এই দ্বীপটিতে পা রাখেননি। এমনকি ভারত সরকার এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ আদমশুমারিও করে না, আনুমানিক ১০,০০০-এরও কম মানুষের এই বসতি এতকাল ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। কিন্তু ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের একটি মহাপরিকল্পনা এই দ্বীপের শান্ত পরিবেশকে এক ঝোড়ো রাজনৈতিক বিতর্কের আবর্তে ঠেলে দিয়েছে।

১১ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল ও বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পটি মূলত গ্রেট নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের চিরচেনা রূপ ও অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে চলেছে। সরকারের এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, একটি বেসামরিক ও সামরিক যৌথ বিমানবন্দর, একটি শক্তিশালী বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিলাসবহুল পর্যটন পরিকাঠামো এবং সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের বসবাসের উপযোগী একটি আধুনিক টাউনশিপ। শুরুতে নয়াদিল্লি এই মেগা প্রকল্পের পেছনে সামুদ্রিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং রাজস্ব আয়ের যুক্তিকে সামনে এনেছিল। সরকারের দাবি ছিল, এই বন্দরটি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের একটি প্রধান হাব হিসেবে ভারতের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।

তবে প্রকল্পের কাজ শুরুর ঘোষণা আসতেই তীব্র বাধার মুখে পড়ে সরকার। বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদী সংস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এই বিপুল পরিমাণ নির্মাণের ফলে দ্বীপটির অনন্য জীববৈচিত্র্য, রেইনফরেস্ট এবং বিরল সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে, যা মূলত গ্রেট নিকোবারের প্রাকৃতিক অস্তিত্বেরই অবসান ঘটাতে পারে। এই ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও আন্দোলনের মুখে নয়াদিল্লি কৌশলগতভাবেই তার অবস্থান ও প্রচারের ভাষা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব ছাপিয়ে সরকার এখন এই পরিকল্পনাটিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত লক্ষ্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে তুলে ধরছে।

বিশেষ করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘকালীন সংঘাত ভারতের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালো করেছে। হরমুজ প্রণালীর মতো একটি কৌশলগত জলপথ যেভাবে বৈশ্বিক সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে ভূমিকা রাখে, ঠিক একই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে গ্রেট নিকোবারকে ঘিরে। ভারতের এই দ্বীপটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম সামুদ্রিক পথ ‘মালাক্কা প্রণালী’র প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। উল্লেখ্য, এই মালাক্কা প্রণালীর মধ্য দিয়েই সমগ্র বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগ প্রবাহিত হয়, যার ওপর চীন গভীরভাবে নির্ভরশীল।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান ভারত মহাসাগরীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সমুদ্রপথে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে রুখে দিতে গ্রেট নিকোবার ভারতের জন্য একটি হরমোজ-সদৃশ কৌশলগত প্রতিবন্ধক বা ‘চেকপয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করতে পারে। যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে এই দ্বীপ থেকে ভারত সহজেই মালাক্কা প্রণালীর নৌবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি করতে সক্ষম হবে। ফলে, যে দ্বীপটি একসময় ভারতের মানচিত্রে কেবলই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল ছিল, তা এখন চীনের বিরুদ্ধে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠছে। পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি আর জাতীয় নিরাপত্তার অমোঘ প্রয়োজনীয়তা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মাঝেই গ্রেট নিকোবার এখন ভারতের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষার এক নতুন রূপরেখা তৈরি করছে।

সূত্র:  আলজাজিরা