ফিলিপাইনে ভূমিকম্পে নিহত অন্তত ৩৭, শত শত আফটারশক

দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে আঘাত হেনেছে ৭.৮ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৭ জন নিহত এবং ৪৮৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জরুরি উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে পৌঁছানোর সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সোমবার সকালে আঘাত হানা এই মূল ভূমিকম্পের পর অঞ্চলটিতে শত শত আফটারশক বা অনুকম্পন অনুভূত হয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে ব্যাহত করছে এবং স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ফিলিপাইনের বিজ্ঞানমন্ত্রী ও প্রবীণ ভূকম্পবিদ রেনাতো সলিডাম জানান, "এই এলাকাগুলো আগেও শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে, তবে এটি অন্যতম শক্তিশালী একটি।"

দেশজুড়ে সুনামি সতর্কতা ও জনজীবন বিপর্যস্ত
ভূমিকম্পের তীব্রতার কারণে ফিলিপাইনের পাশাপাশি মিন্দানাওয়ের দক্ষিণে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়া এবং জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল জুড়ে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ভূমিকম্পের আঘাতে মিন্দানাও দ্বীপের বিশাল অংশে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট ফেটে চৌচির হয়ে গেছে এবং অনেক সড়ক ভূমিধসের নিচে চাপা পড়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগহীন অবস্থায় রয়েছে। দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার সহকারী সচিব বার্নার্দো আলেজান্দ্রো জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২,০০০ বাড়ি এবং ৬,০০০ সরকারি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তাদের মূল অগ্রাধিকার হলো নিখোঁজদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানো।

রক্ষা পেল হাজারো শিক্ষার্থী
সোমবার (৮জুন) সকালে ভূমিকম্পটি যখন আঘাত হানে, তখন মিন্দানাওয়ের স্কুলগুলোতে সাপ্তাহিক প্রথা অনুযায়ী পতাকা উত্তোলন ও সকালের সমাবেশ চলছিল। খোলা মাঠে অবস্থান করার কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। লেবাক শহরের এক স্কুল শিক্ষক সিজার সুন্দো জানান, ‘আমাদের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানটিই আক্ষরিক অর্থে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল দুই মিনিটেরও বেশি সময় ধরে কোনো এক দোলনায় আমাদের প্রচণ্ডভাবে দোলানো হচ্ছে।’ তবে আকস্মিক এই কম্পনে হাজার হাজার শিশু আতঙ্কিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

উদ্ধারকাজে বাধা ও দুর্গম পরিস্থিতি
ভূমিধসের কারণে দুর্গম অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দাভাও অক্সিডেন্টালের হোসে আবাদ সান্তোস শহরের মেয়র জেসন জন জয়েস জানিয়েছেন, ভূমিধসের কারণে তাদের একমাত্র মহাসড়কটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দূরবর্তী গ্রামগুলোতে কেবল আকাশপথে (বিমানে) ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।

এদিকে দেশটির স্বাস্থ্য সচিব তেওদোরো হারবোসা জানিয়েছেন, চিকিৎসকেরা যখন আহতদের জরুরি সেবা দিচ্ছিলেন, তখনও একের পর এক শক্তিশালী আফটারশক আঘাত হানছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দুর্যোগ মোকাবেলায় সমগ্র সরকারি ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পরিস্থিতি তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছেন।

ভূমিকম্পের উৎস ও ভৌগোলিক কারণ
ভূকম্পনবিদদের মতে, সোমবারের এই ভূমিকম্পটি মূলত দেশের দক্ষিণ প্রান্তের 'কোটাবাটো ট্রেঞ্চ'-এর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ঘটেছে। এই খাতটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; এর আগে ১৯৭৬ সালে এখান থেকে উৎপন্ন ৭.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে প্রায় ৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। উল্লেখ্য, ফিলিপাইন ভৌগোলিকভাবে ‘প্যাসিফিক রিং অফ ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে থাকে।

সূত্র: বিবিসি