আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার (১০ জুন) পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়ে ২৬ জন তালেবান যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে, তবে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে হামলায় নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু ও নারী।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দেশটির সামরিক বাহিনী সীমান্ত বরাবর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করেছে। তার দাবি অনুযায়ী, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি-র গোপন আস্তানা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং গোলাবারুদের ভাণ্ডার লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে টিটিপি কমান্ডার আলিম খান খুশালি ও আখতার মুহাম্মদ জানি খেলের অবস্থানগুলো ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে খাইবার পাখতুনখোয়া ও উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পরিচালিত ধারাবাহিক আত্মঘাতী ও গেরিলা হামলার জেরে এই প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হয়েছে। গত ৯ জুন মুসা দারায় একটি আধাসামরিক পোস্টে হামলা এবং ২ জুন উত্তর ওয়াজিরিস্তানের সামরিক পোস্টে আত্মঘাতী হামলায় পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছিলেন। তথ্যমন্ত্রী তারার দাবি করেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' চালানো হয়েছে যাতে কোনো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
অন্যদিকে, তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক তীব্র প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, কুনার, খোস্ত এবং পাক্তিকা প্রদেশে পরিচালিত পাকিস্তানের এই হামলায় অন্তত ১১ জন শিশু, একজন নারী এবং একজন বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। তিনি এই ঘটনাকে 'মানবিক অপরাধ' হিসেবে বর্ণনা করে আরও জানান যে হামলায় ১৪ জন নারী ও শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। খোস্ত ও পাক্তিকা প্রদেশের স্থানীয় বাসিন্দারা ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে নিশ্চিত করেছেন যে, বিমান হামলায় আবাসিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নিহতদের মধ্যে অবোধ শিশুরা রয়েছে। বারমাল ও স্পেরা জেলায় সাধারণ মানুষের ঘরে বোমা বর্ষণের ফলে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে বলে তারা দাবি করেন।
২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে আসছে যে, কাবুল টিটিপি যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। বিপরীতে, আফগান প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে সীমান্ত সংঘাতে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত মার্চ মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্তমান এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে মধ্য এশিয়ায় নিরাপত্তা সংকট ও মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা