পাকিস্তানের কাশ্মীর ভারতের অংশ: ভারতীয় সেনাপ্রধান

পাকিস্তান-শাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই অঞ্চল এখনও সন্ত্রাসী অবকাঠামো গড়ে তোলা, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অবকাঠামোগত তৎপরতাও ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির জ্যেষ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক আদিত্য রাজ কৌলকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী এসব মন্তব্য করেন। মঙ্গলবার, ৩০ জুন অবসরে যাওয়ার ঠিক একদিন আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি উত্তর সীমান্ত, ভারত-চীন সম্পর্ক, কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং ভারতের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

তিনি বলেন, ভারত-চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলএসি বরাবর বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও সেটি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল। তার ভাষায়, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া মানে এই নয় যে ভারত আত্মতুষ্টিতে ভুগছে। সম্ভাব্য যেকোনো নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী শক্তিশালী মোতায়েন ব্যবস্থা এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রেখেছে।

জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, উত্তর সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। দুই দেশই এখন একে অপরের উদ্বেগের বিষয়ে তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল ও ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তিনি জানান, সেনা প্রত্যাহারসংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি সীমান্তে স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। গত এক বছরে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হওয়ায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নানা বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং পারস্পরিক আস্থাও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণের সম্ভাব্য বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখতে ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশনের অধীনে বিশেষজ্ঞ দল গঠন, কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় চালুর উদ্যোগ, সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের পরিকল্পনা, তিনটি সীমান্তপথ দিয়ে বাণিজ্যে ঐকমত্য এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সামরিক পর্যায়েও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আস্থা তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ চলছে বলে জানান সেনাপ্রধান। তার ভাষায়, প্রতিবছর দুই পক্ষের মধ্যে এক হাজার ১০০টিরও বেশি মাঠপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া হটলাইন, পতাকা বৈঠক এবং কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনার মতো প্রতিষ্ঠিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনোভাবেই আত্মতুষ্ট নয়। সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, নজরদারি জোরদার, রসদ সরবরাহ, সেনা চলাচলের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামরিক প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তার ভাষায়, স্থিতিশীলতা কখনোই আত্মতুষ্টির সমার্থক নয়। যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি প্রতিহত করা এবং যেকোনো পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রেখেছে। উত্তর সীমান্তে অবকাঠামো উন্নয়ন, গোয়েন্দা নজরদারি, রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা, সেনা চলাচলের সক্ষমতা এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সম্পর্কেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন জেনারেল দ্বিবেদী। তিনি বলেন, ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সংলাপের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করা এবং একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি, মোতায়েন ব্যবস্থা ও অবকাঠামোকে সবসময় কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় রাখা।

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই অঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের সুস্পষ্ট ও অপরিবর্তিত অবস্থান। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন ওই অঞ্চলগুলো এখনও সন্ত্রাসী অবকাঠামো গড়ে তোলা, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জম্মু ও কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তার মতে, এটি এখনও ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সামরিক পরিকল্পনায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে বিদেশি সামরিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কেও ভারত সম্পূর্ণ সচেতন। বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সেনা মোতায়েন, নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামরিক প্রস্তুতি সর্বদা বজায় রাখা হয়েছে বলেও জানান বিদায়ী এই ভারতীয় সেনাপ্রধান। সূত্র: এনটিভি