‘বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে অখুশি হবে ভারত’

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সামনে আসায় ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত এই নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে নয়াদিল্লি কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমনিতেই একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন থাকলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ রাখার চেষ্টা চলছে।

এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। চলতি মাসে তাঁর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তিনি ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। একই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে নয়াদিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

চলতি মাসে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় বাংলাদেশ এর সমালোচনা করে। এর আগে তাঁর ভারত সফরের ক্ষেত্রে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছিল ঢাকা।

এমন পরিস্থিতিতে মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মক্কা প্যাক্ট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারত এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো অবস্থান জানায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবে নাও নিতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে ঢাকার এমন সিদ্ধান্তকে ভারতের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হতে পারে।

তবে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু ভারতীয় প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যোগদানের আগে এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহীনের মতে, কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদানের ধারণা দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি শুধু এটুকু হওয়া উচিত নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। ফলে মক্কা প্যাক্টে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি। তবে বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেই নয়, ঢাকার সামগ্রিক কৌশলগত ও পররাষ্ট্রনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স