ভারতের দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও পিছু হটছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে আজ সকাল ১০টায় আবারও দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে দলটি ও একাধিক ছাত্রসংগঠন। ‘ভোট চুরি’ এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তুলে তারা প্রতিদিনই বিক্ষোভ মিছিল চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
শনিবার (১১ অক্টোবর) দিল্লিতে সিজেপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধরপাকড়ের পর দলটির নেতারা বলেন, এসব আটক ও পুলিশি পদক্ষেপ তাঁদের আন্দোলন থামাতে পারবে না। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে-সহ শীর্ষ নেতারা আটক থাকায় বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংগঠনের জাতীয় পর্যায়ের নেতা অজিঙ্কা শিন্ডে।
শিন্ডে বলেন, “সরকার হয়তো ভেবেছিল, আজ আটকের পর আমরা বাড়ি ফিরে যাব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের এই ভয়ই প্রমাণ করে, লড়াইয়ের অর্ধেক আমরা জিতে গেছি।”
তিনি আরও বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল হবে।”
শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল সিজেপি। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভের অনুমতি না থাকায় কর্মসূচি ঠেকাতে অভিযান চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দিল্লিজুড়ে অন্তত ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষকে আটক করার তথ্য এসেছে। আটক ব্যক্তিদের পরে অনেকে মুক্তি পান।
সিজেপির নেতারা বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, দিল্লিতে বিমান অবতরণের পর সকাল ১১টার দিকে অভিজিৎ দিপকে ও অন্য নেতাদের আটক করা হয়। এরপর তাঁদের কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা তাঁরা জানতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন দলীয় নেতারা।
দিপকের দাদির মৃত্যু নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলটি। মহারাষ্ট্রে তাঁর নিজ শহরে দাদি মারা গেলেও আটক থাকায় শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, দিপককে শেষকৃত্যে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না।
সিজেপির অনুপস্থিত প্রতিষ্ঠাতা দিপকে আগেই শিন্ডেকে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
এদিকে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রোববার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা হবে; পুলিশ যেখানে ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেবে, সেই জায়গাকেই ‘যন্তর মন্তর’ বানিয়ে তোলা হবে।
বিরোধী জোটেরও কর্মসূচি
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকও সোমবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, ওই দিন জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন।
শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে চার দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছিল জোটটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের দায়মুক্তি দেওয়া ২০২৩ সালের আইন বাতিল, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) স্থগিত এবং তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম পুনর্বহাল।
এ ছাড়া সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালট ফিরিয়ে আনা এবং গত দুই বছরে যেসব বিধানসভা নির্বাচনে ‘ভোট চুরির’ অকাট্য প্রমাণ রয়েছে বলে জোটটি দাবি করছে, সেসব নির্বাচন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে।
শনিবার আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।
দিল্লিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর অন্তত ২৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪৫টি দিল্লি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়, ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল করা হয় এবং যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয়। পুলিশ সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, নারী ও প্রবীণদের আগে মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল এবং রোববারও নিরাপত্তা মোতায়েন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা ছিল।
চেন্নাইয়ে একটি ছাত্রসংযোগ কর্মসূচিতে থাকা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন। সব তরুণকে গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন। আমরা আপনাদের ঘিরে আছি, পিছু হটব না।” তিনি ভারতের তরুণদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
আটক হওয়ার আগে কেজরিওয়ালও বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, মোদি যেখানে বাধা দেবেন, সেখানেই বসে পড়ে জায়গাটিকে যন্তর মন্তরে পরিণত করতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার চেয়েও গুরুতর বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন কর্মসূচির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতের গণতন্ত্র অরাজকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে এবং দেশ পরিচালিত হবে সংসদের মাধ্যমে, রাস্তায় বিক্ষোভের মাধ্যমে নয়।
মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানেও সিজেপির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভের সময় প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী ও অভিনেতা ইমরান খান। আহমেদাবাদ ও চেন্নাইসহ অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ও আটকের খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র: এনডিটিভি।