ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতা, সৌদির সুরক্ষায় পাকিস্তানের দ্বৈত চাল

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। একই সময়ে ইরানের মিত্র হুথিদের হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে ইসলামাবাদ। ফলে একদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতার পথ খোলা রাখছে দেশটি, অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতাও জোরদার করছে। ইসলাবাদের দ্বিমুখী এই অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে। 

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইর সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও মুনিরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে হোয়াইট হাউসে তাঁর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তিনি।

গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান। তবে সেই যুদ্ধবিরতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এরপরও দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার যোগাযোগ চালু রেখেছে ইসলামাবাদ।

সৌদি আরবের নিরাপত্তায়ও সরাসরি ভূমিকা নিচ্ছে পাকিস্তান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে প্রায় আট হাজার সেনা, এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মোতায়েনের ব্যয় বহন করেছে সৌদি আরব।

গত আগস্টে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদ জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব চুক্তিটির অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবে তুরস্কের অনুমোদন তখনো বাকি ছিল। সৌদি ভূখণ্ডে ইরানপন্থী হুথিদের হামলার পর আরও সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়েও দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

এর মধ্যে বুধবার (২১ অক্টোবর) তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে আরেকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে পাকিস্তান। কাতারের রাজধানী দোহায় সই হওয়া ‘বদর’ চুক্তিতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা ও যৌথ উৎপাদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। মক্কা চুক্তির পাশাপাশি নতুন এই উদ্যোগগুলো বিভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থসম্পন্ন দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করছে।

তবে মুনিরের তেহরান সফর ঘিরে পাকিস্তানের এই দ্বিমুখী অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে পাকিস্তান সরকারের সূত্র জানিয়েছে, সফরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেয়ে সৌদি আরবে হুথিদের হামলা বন্ধের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সৌদি আরবকে রক্ষায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে মুনির ইরানি নেতাদের হুথিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ ছাড়া ওই অঞ্চলে বসবাস করেন লাখ লাখ পাকিস্তানি কর্মী। সৌদির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে আর্থিক সহায়তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে পাকিস্তান এমন একটি অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে দেশটি একই সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী, সৌদি আরবের সামরিক অংশীদার এবং নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগের অংশীদার। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়লে এই ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা অঙ্গীকার যত বাড়বে, ততই পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে পারে ইসলামাবাদ। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল