ইরানের পক্ষ থেকে "ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক টায়ার শহরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন এবং রেড ক্রসের কর্মীসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই হামলার ফলে একটি বহুতল আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নিকটবর্তী ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঘোষিত আংশিক যুদ্ধবিরতির পর এটিকে সবচেয়ে বড় এবং উদ্বেগজনক উত্তেজনা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি:
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই টায়ারের একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে মিসাইল হামলা চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে একটি বহুতল ভবন ধুলোয় মিশে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ চালানোর সময় দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হলে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের একাধিক কর্মী আহত হন। প্রাচীন ফিনিশিয়ান সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু টায়ারের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোও এই হামলার ধাক্কায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর পাল্টা অবস্থান:
হামলার দায় স্বীকার করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, টায়ার শহরের খ্রিস্টান কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছিল এবং সেখান থেকে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা দল হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে পাল্টা ১৬টি সফল সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি সামরিক যান ধ্বংস করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক ড্রোন ভূপাতিত ও আটক করার দাবি করেছে সংগঠনটি।
ইরানের হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক যুদ্ধের মেঘ:
এই হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তেহরান থেকে ইরান সরকার স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিল, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ইরান চুপ থাকবে না এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে "ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া" জানানো হবে। ইরানের এই সরাসরি হুঁশিয়ারির পরপরই ইসরায়েলের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মানবিক সংকট ও জাতিসংঘের উদ্বেগ:
এদিকে হামলার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী টায়ার শহরের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অবিলম্বে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য 'জোরপূর্বক স্থানান্তরের নির্দেশ' জারি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সাধারণ মানুষকে এভাবে বাস্তুচ্যুত করার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি ইসরায়েলের এই আদেশের বৈধতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমানে লেবাননে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতা:
গত মার্চ ২০২৬ থেকে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া এই প্রত্যক্ষ সংঘাতের পর এপ্রিলের আংশিক যুদ্ধবিরতি অঞ্চলটিতে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু মঙ্গলবারের এই রক্তক্ষয়ী হামলার পর সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার মুখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পরাশক্তিগুলো একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি পুনঃস্থাপনের জন্য কূটনৈতিক চাপ তীব্রতর করছে। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সরাসরি সংঘাত লেবাননকে শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে কি না, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
শান্তি আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে পাকিস্তান ও লেবাননের সেনাপ্রধানের বৈঠক