ফ্রান্সের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের কড়াকড়ির ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির বর্তমান বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ। তিনি ফ্রান্সে বৈধ অভিবাসন সাময়িকভাবে তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখার একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন।
সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন প্রস্তাবের পর দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ফরাসি সাপ্তাহিক গণমাধ্যম জার্নাল দু দিমঁশ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দারমানাঁ বলেন, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থাপনা তীব্র চাপের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বৈধ অভিবাসনে সাময়িক বিরতি টানা প্রয়োজন হতে পারে। পরবর্তীতে ল্য প্যারিজিয়েন ও আরটিএল ফ্রান্স-সহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় ফরাসি গণমাধ্যমে বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়।
ফ্যামিলি ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
সাক্ষাৎকারে বিচারমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে কাজের ভিসা (ওয়ার্ক পারমিট) এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের (ফ্যামিলি রিইউনিয়ন) মতো নিয়মিত ও আইনি অভিবাসন পথগুলোও বন্ধ বা স্থগিত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন যারা নিজের পরিবারকে ফ্রান্সে নিয়ে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
ভিসা প্রসেসিংয়ে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ভিসা এবং আবাসন (রেসিডেন্স পারমিট) প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি কয়েক গুণ বেড়েছে।
বর্তমানে রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং সাক্ষাৎকার (ইন্টারভিউ) প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।
প্রবাসীদের মুখে দুশ্চিন্তার সুর
এদিকে ফ্রান্সে অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা ও বহিষ্কার (ডিটেনশন ও ডিপোর্টেশন) কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈধ কাগজধারীদের মনেও।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (প্যারিস, লা শাপেল): "আমার স্ত্রীর ফ্যামিলি রিইউনিয়নের ফাইলটি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে আছে। এরই মধ্যে নতুন এই প্রস্তাবের খবর আসার পর আমাদের পরিবারের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেছে।"
আবদুল কাদের (সেন-দেনি): "এমনিতেই ফ্রান্সের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া খুবই ধীরগতির। এখন যদি নতুন কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত আসে, তবে আমাদের অপেক্ষার সময় আরও কত বছর বাড়বে তা কেউ জানে না।"
নাজমুল ইসলাম (লিয়ন): "বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই তাদের পরিবারকে ফ্রান্সে নিয়ে আসার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।"
এটি কি এখনই আইন? বিশ্লেষকরা যা বলছেন
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার এখনই কোনো কারণ নেই। কারণ এটি বর্তমানে কোনো পাস হওয়া 'আইন' নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব মাত্র।
এটি কার্যকর করতে হলে ফরাসি পার্লামেন্টে দীর্ঘ আলোচনা, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন এবং বেশ কিছু আইনি জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক মাস এই প্রস্তাব নিয়ে রাজনীতিতে নানা আলোচনা-সমালোচনা চললেও ২০২৬ সালের আগে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তবে ২০২৭ সালের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভিবাসন ইস্যুটি দেশটির রাজনীতিতে আরও বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিত।
আপাতত প্রস্তাবটি পাস না হলেও, এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসী ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।