চুয়াডাঙ্গায় ‘মৌখিক নির্দেশে’ সিসি ক্যামেরা কিনে বিপাকে ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার অজুহাতে জেলা প্রশাসনের ‘মৌখিক নির্দেশে’ সিসিটিভি ক্যামেরা কিনে চরম প্রশাসনিক ও আর্থিক বিপাকে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। 

 

নির্বাচনকালীন রিটার্নিং অফিসার তথা তৎকালীন জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে সরাসরি তাগিদ পেয়ে বাকিতে এসব সরঞ্জাম কেনা হলেও নির্বাচন শেষে এখন পুরো বিষয়টিই লিখিতভাবে অস্বীকার করছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়।

 

দোকানদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে শিক্ষকেরা এখন নিজেদের পকেটের টাকা ও ধার-দেনা মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের এই অনানুষ্ঠানিক চাপ ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনে চরম ক্ষোভে ফুঁসছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকমণ্ডলী।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের সময়ে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার কথা বলে রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপন করা হয়। তবে নির্বাচন পার হয়ে গেলেও খরচের বড় অংশই মেলেনি। লিখিতভাবে অস্বীকার করা হলেও পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়, যা মোট ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশের কম।

 

সদর উপজেলার কেদারগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শোয়েব হোসেন বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমার বিদ্যালয়টিকে ভোটকেন্দ্র করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক (রিটার্নিং অফিসার)-এর নির্দেশে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস প্রতিটি কক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বাধ্য হয়ে দোকানে বাকি রেখে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৭টি সিসি ক্যামেরা ও একটি মনিটর বসাই। কিন্তু নির্বাচন শেষে নতুন জেলা প্রশাসক যোগ দেয়ার পর ইউএনওর মাধ্যমে আমরা মাত্র ১৫ হাজার টাকা পাই। বাকি ব্যয়ের বিষয়ে বারবার মাসিক সভায় তুলে ধরেও কোনো সুরাহা মেলেনি।’

 

একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তুহিন সুলতানা আক্ষেপ করে জানান, বকেয়া পরিশোধের জন্য শিক্ষকদের নিজেদের পকেটের টাকা ও ধার-দেনা করতে হয়েছে। একই দুর্ভোগের কথা জানান সুমিরদিয়া পুটি মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হোসনে আরা। 

 

তিনি জানান, শিক্ষা অফিসের নির্দেশনায় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয়ে ৫টি ক্যামেরা বসালেও পেয়েছেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, রেলবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লতিফুন্নেছা জানান, ৯টি ক্যামেরা বসিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বরাদ্দই পাননি তারা।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য লিখিত কোনো সরকারি আদেশ দেয়া হয়নি। তবে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিন শিক্ষকদের ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে জানান যে, তৎকালীন জেলা প্রশাসক নিয়মিত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের তাগিদ দিচ্ছেন এবং দুই দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্নের নির্দেশনা দেন।

 

মাঠপর্যায়ের এই চাপের সত্যতা স্বীকার করে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে ন্যূনতম ৬টি ক্যামেরা বসানোর কথা বলা হয়েছিল। তৎকালীন রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও তৎকালীন ইউএনও রিফাত আরাকে নির্দেশ দেন, আর ইউএনও আমাদের জানান। তবে এসবের কোনো লিখিত আদেশ ছিল না, সবই হয়েছে মৌখিকভাবে।’

 

প্রশাসনিক এই জটিলতার বিষয়ে জানতে নির্বাচনকালীন দায়িত্বে থাকা তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

পরবর্তীতে তথ্য অধিকার আইনে ডিসি কার্যালয়ে সিসিটিভি ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলে, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার মো: আশফাকুর রহমান লিখিত জবাবে জানান—জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই কার্যালয় থেকে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ক্রয় বা ক্রয়ের নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি।

 

বর্তমান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও এ বিষয়ের কোনো দায় নিতে রাজি নন। চুয়াডাঙ্গার বর্তমান জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার জানান, ‘আমি নির্বাচনের দুই মাস পর এখানে যোগদান করেছি। তখন কী হয়েছিল তা আমার জানা নেই। নির্বাচনের বরাদ্দ নির্বাচনের সময়ই আসে, পরে আসে না। যেহেতু তখনকার জেলা প্রশাসক বা ইউএনও কেউ দায়িত্বে নেই, তাই পেছনের ঘটনার দায়ভার নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

 

অনুরূপ মন্তব্য করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র। ঘটনাটি তার যোগদানের আগের হওয়ায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।

 

ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের এমন দ্বিমুখী অবস্থান ও মৌখিক নির্দেশের অজুহাতে অর্থ আটকে থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদরের ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। এই অচলাবস্থা নিরসনে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।