মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবল বর্ষণে গত অর্থবছরে নির্মিত অনেক কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ক্ষেত এবং শত শত মাছের খামার। কৃষি বিভাগ বলছে অিব্যহত ভারী বর্ষনে উপজেলার কৃষি ও মৎস্যখাতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন কুকুরীমুকরী, মুজিবনগর, চর মানিকা, হাজারীগঞ্জ ও জাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কাঁচা সড়ক কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোও ভোগান্তিতে পড়েছে।
পানিবন্দী গৃহবধূ রাশেদা বেগম বলেন, ‘ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। নিজের ঘরে থাকতে পারছি না, অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। রান্নাবান্নাও করতে পারছি না। দ্রুত সরকারি সহযোগিতা চাই।’
কৃষকেরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আমনের বীজতলা ও সবজির জমি তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
চর মানিকা ইউনিয়নের কৃষক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমার আমনের বীজতলা এবং শশা, করলা, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের লোকসান হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে টানা বর্ষণে মাছের ঘেরের বাঁধ উপচে পানি ঢুকে পড়ায় মুহূর্তেই লাখ লাখ টাকার মাছ নদী ও খালে চলে গেছে। এতে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করা অনেক খামারি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
স্থানীয় মাছচাষি মো. ইয়াছিন মুন্সি বলেন, ‘গত ৩০ বছরে এমন বৃষ্টি দেখিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমার ঘেরের সব মাছ ভেসে গেছে। কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
আরেক মাছচাষি মো. নুর উদ্দিন ফরাজি বলেন, ‘এখন নদীতে জেলেদের জালে আমাদের পুকুরের রুই-কাতলা উঠছে। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের। সারা বছরের পরিশ্রম এক বৃষ্টিতেই শেষ হয়ে গেল।’
চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের মৎস্যচাষি মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, ‘সাত বছর ধরে মাছ চাষ করছি। কিন্তু এবারই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমার তিনটি খামার পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, প্রাথমিক হিসেবে চরফ্যাশনে ২ হাজার ৩৬০ জন মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মৎস্য খামার, যার মোট আয়তন প্রায় ২১৮ হেক্টর, পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৭২ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর সবজির জমি এবং ১৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে শশা, করলা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচামরিচ, বরবটি ও ধুন্দলসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি। পানি দ্রুত নেমে গেলে অধিকাংশ ফসল পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় পানি জমেছিল, সেখানে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। কৃষক ও মৎস্যচাষীদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে চরফ্যাশনের কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষীদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।