ঐতিহ্যবাহী ভাণ্ডারি মুলা সংরক্ষণে অর্গানিক চাষের আহ্বান

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হালদা নদীর বালুচরে চাষ হওয়া ঐতিহ্যবাহী বিশালাকৃতির নাদির মুলা স্থানীয়ভাবে ভাণ্ডারি মুলা হিসেবে পরিচিত। ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ সংলগ্ন হাট-বাজারে এ মুলা বেচা-বিক্রি শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ জানুয়ারি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পবিত্র ওরশকে কেন্দ্র করে এই মুলার উৎপাদন ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। 

তবে এ মুলা চাষে কৃষকরা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং হালদার বালুচরে অবৈধ বালু উত্তোলনসহ নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ফসলের উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঐতিহ্যবাহী ভাণ্ডারি মুলাকে সংরক্ষণের জন্য অর্গানিক চাষে মনোযোগ দেওয়া জরুরি বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, দরবার সংলগ্ন ছোট-বড় বাজার, অস্থায়ী দোকান এবং রাস্তার পাশে সাজানো ভাণ্ডারি মুলা ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আকারে বিশাল, লম্বা ও চকচকে হওয়ায় এটি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ভক্ত ও অনুরাগীদের কাছে স্মারক ও তবারক হিসেবে জনপ্রিয়। ফলস্বরূপ, ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে সঙ্গে এটি স্থানীয় কৃষকদের জন্য লাভজনক ফসল হিসেবেও পরিচিত।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, ভাণ্ডারি মুলা সাধারণত ২ কেজি থেকে ৪ কেজি বা তারও বেশি ওজনের হয়, কিছু ক্ষেত্রে ৫ কেজি পর্যন্তও পাওয়া যায়। স্বাদে এটি সাধারণ মুলার তুলনায় বেশি রসালো এবং ঝাঁজ কম। রান্না ও সালাদ উভয় ক্ষেত্রে এটি জনপ্রিয়। ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, মূলত নাজিরহাট, সুয়াবিল ও সুন্দরপুর ইউনিয়নের হালদা নদী বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এই মুলার চাষ হয়। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ভাণ্ডারি মুলা মূলত জাপানি ‘তাকি’ জাতের হাইব্রিড। হালদা নদীর উর্বর মাটিতে মাইক্রোবিয়াল কার্যক্রম বেশি থাকায় মুলার আকার, স্বাদ ও গুণমান অনন্য। তিনি আরও জানান, একই জাতের মুলা অন্য এলাকায় চাষ করলেও কাঙ্ক্ষিত মান পাওয়া যায় না।

বর্তমান বাজারদর প্রতি মুলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা। তবে ওরশের মূল দিনগুলোতে চাহিদা বাড়লে এটি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। তবে বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হালদা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বালুচরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি, কৃষকরা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে হালদার তীরের উৎপাদন ক্ষমতা ভবিষ্যতে হ্রাস পেতে পারে। অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রভাব মাটির গুণগত মান ও নদীর পানিকে দূষিত করে, যা পরবর্তী বছরগুলিতে ফসলের উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে।

তারা আরও জানান, হালদার তীরের উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষায় অর্গানিক ও টেকসই চাষাবাদ অপরিহার্য। কমপোস্ট ও প্রাকৃতিক সার ব্যবহার, ফসল পরিবর্তন এবং পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি গ্রহণ করলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকবে এবং পানি ও পরিবেশ দূষণ কমবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, হালদা নদীর তীরে মাটির গুণগত মান রক্ষা এবং ঐতিহ্যবাহী ভাণ্ডারি মুলাকে সংরক্ষণের জন্য এখনই অর্গানিক চাষে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, হালদা নদীতে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নদী ও এর জীববৈচিত্র্য চরম হুমকিতে পড়বে। কৃষকদের অর্গানিক সার ব্যবহার ও কীটনাশকবিহীন চাষে উৎসাহিত করা জরুরি, নয়তো মাটির গুণগত মান নষ্ট হবে।

ফটিকছড়ি উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম জানান,
হালদা নদীর প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় ফটিকছড়ি প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভাণ্ডারি মুলা শুধু কৃষিপণ্য নয়, এটি ফটিকছড়ির সংস্কৃতি, ধর্মীয় আবেগ, কৃষিভিত্তিক জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য। ওরশ উপলক্ষে এর বাজার প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। হালদা নদীর বালুচরে উৎপাদিত ভাণ্ডারি মুলা ঐতিহ্য ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকরা যদি একত্রিতভাবে নদী সংরক্ষণ ও অর্গানিক চাষাবাদ নিশ্চিত করেন, তবে এই প্রাচীন ঐতিহ্য ওরশসহ ভবিষ্যতেও সমৃদ্ধিশালীভাবে টিকে থাকবে।