চাহিদার অর্ধেক মিলছে বিদ্যুৎ, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে নিত্যদিনের লোডশেডিং এখন স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অথচ চরম দুঃসহ অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ মারাত্মক লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে।

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ঘনঘন লোডশেডিং এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকা এখনকার স্বাভাবিক চিত্র। এই সংকটের কারণে স্থানীয় মানুষের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চরম অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা এবং গাফিলতির কারণেই আজ টেকনাফবাসীর এই চরম ভোগান্তি। দুর্বল ও জরাজীর্ণ ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।

বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির এমন শোচনীয় রূপ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠলেও, টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বা কর্ণপাত করতে দেখা যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিতরণের এই চরম বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদরাও। কক্সবাজার সিটি কলেজের একজন শিক্ষক আক্ষেপ করে জানান যে, যখন জেলা শহরে তেমন কোনো লোডশেডিং হচ্ছে না, তখন টেকনাফ উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহে এত সুষ্পষ্ট ও অমানবিক বৈষম্য কেন করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। টেকনাফে দিনে এবং রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে। ফলে টেকনাফের প্রতিটি গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল, হাট-বাজার এবং শহরের মানুষ এক ধরনের চরম অস্থিতিশীল ও দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার ফলে পুরো উপজেলায় তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তীব্র গরমে বাসা-বাড়ি, মসজিদ ও মাদ্রাসায় পানির অভাবে হাহাকার তৈরি হয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়িতে থাকা রেফ্রিজারেটর, ফ্যান, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকায় কিংবা অতিরিক্ত লোড-ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে দ্রুত নষ্ট ও অচল হয়ে পড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সময়গুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের বেচাকেনা লাটে উঠেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পোল্ট্রি খামার, বরফ কল এবং ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বর্তমান যুগে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইটি সেক্টর ও চিকিৎসা,সব খাতেই বিদ্যুতের অপরিহার্য প্রয়োজন। বিশেষ করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও রক্তের জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সময়মতো করা যাচ্ছে না, যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু রোগীরা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। অনেক সময় গ্রাহকদের বাড়িতে না গিয়েই এবং মিটারের রিডিং না দেখেই অনুমান করে অতিরিক্ত বা ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল তৈরি করে পাঠানো হয়, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিচ্ছে। সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে টেকনাফের এই তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, বৈষম্যমূলক লোডশেডিং ও পল্লী বিদ্যুতের অব্যবস্থাপনার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান চান টেকনাফ উপজেলার সর্বস্তরের ভুক্তভোগী জনগণ।