হাসপাতালজুড়ে পানি, কাঁধে-ভেলায় রোগী নিয়ে ছুটছেন স্বজনরা

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের সামনের সড়ক থেকে শুরু করে পাঁচটি ভবনের নিচতলা পর্যন্ত হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের স্বজনরা কখনো কাঁধে বহন করে, আবার কখনো ভেলায় ভাসিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসছেন।

বন্যার পানিতে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের সাতটি ইউনিট ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের পাঁচটি ভবনের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় টেবিল বসিয়ে বহির্বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রবেশ সড়কে এখনও হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। শুধু হাসপাতালই নয়, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের আবাসিক ভবনগুলোও পানিতে ডুবে গেছে। এতে তারাও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কোমরসমান পানি মাড়িয়ে রোগীদের হাসপাতালে প্রবেশ করতে হচ্ছে। হাসপাতাল চত্বরের চারপাশজুড়েই পানি থইথই করছে। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কগুলো প্লাবিত থাকায় অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না। কেবল গুরুতর অসুস্থ, দুর্ঘটনায় আহত এবং প্রসূতি রোগীদেরই নানা কষ্টে হাসপাতালে আনা হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছেন মাত্র ৪৮ জন রোগী। তাদের মধ্যে কয়েকজন জানান, কেউ কোমরসমান, আবার কেউ গলাসমান পানি অতিক্রম করে হাসপাতালে পৌঁছেছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম দফায় বন্যার পানি হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করে। পরদিন পানির উচ্চতা গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমলেও এখনও পুরো হাসপাতাল এলাকা কোমরসমান পানিতে নিমজ্জিত। এ সময় হাসপাতালের ল্যাবরেটরির অনেক মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।

রোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি ওয়ার্ড হাসপাতালের বিভিন্ন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এরই একটি মহিলা ওয়ার্ডে গত চার দিন ধরে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি রয়েছেন ৬০ বছর বয়সী ছেনু আরা। বন্যার কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাঁর স্বজনরা হাসপাতালে আসতে পারছেন না।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা ছেনু আরা। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি একাই অটোরিকশাযোগে হাসপাতালে এসে ভর্তি হন। ওই দিন সন্ধ্যাতেই হাসপাতাল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয় এবং পরদিন পানি গলাসমান হয়ে যায়।

ছেনু আরা বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আমার বাড়ি প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। বাড়িতে আমি একাই থাকি। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি আছি জানলে আমার পছন্দের খাবার নিয়ে মেয়েরা দেখতে আসতো। বিদ্যুৎ ও মোবাইলে নেটওয়ার্ক না থাকায় এখন তাদের ফোনে জানাতেও পারছি না। হাসপাতালে বাইরের সড়কেও পানি। বাড়িতেও ফিরতে সাহস পাচ্ছি না। হাতে যা টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। কেউ ত্রাণ সহায়তাও দেননি। হাসপাতালে যে খাবার খেতে দেওয়া হয়, তা আমি খেতে পারি না।’

শুধু ছেনু আরাই নন, তাঁর মতো আরও অন্তত ৩০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, যারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। হাসপাতালের প্রধান ফটকে কথা হয় আবদুস সালাম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি জানান, এওচিয়া ইউনিয়ন থেকে গলাসমান পানি অতিক্রম করে স্ত্রী ও দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় এখন রোগী আসছেন ১০০ থেকে ১৫০ জন। যারা আসছেন তারা অতি প্রয়োজনে আসছেন। হাসপাতাল ডুবে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে পানির সংকট আছে। বন্যার মধ্যেও ১২টি প্রসব হয়েছে। এখনও হাসপাতালে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। আমরা রোগীদের রান্না করা খাবার দিচ্ছি।’

বন্যার পানিতে হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসাসামগ্রী এবং স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও জরুরি সেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চিকিৎসাসেবা আরও সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।