জ্ঞানচর্চার নতুন ঠিকানা ‘হারুন আল রশিদ (বিএসসি) পাঠাগার’

একটি বই কখনো শুধু জ্ঞানের উৎস নয়, এটি হতে পারে একটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার অনুপ্রেরণা। আর এমন অসংখ্য বই যখন গ্রামের সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে যায়, তখন বদলে যেতে শুরু করে একটি জনপদের চিন্তা, চেতনা ও ভবিষ্যৎ। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের ভূতাইল গ্রামের ‘মো. হারুন আল রশিদ (বিএসসি) পাঠাগার’ আজ ঠিক এমনই এক আলোকিত উদ্যোগের নাম। যেখানে প্রতিদিন বইয়ের সান্নিধ্যে নিজেদের গড়ে তুলছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, গৃহিণী, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণসহ নানা বয়স ও পেশার মানুষ।

গ্রামের একসময়কার অবসর সময় এখন অনেকের কাছেই কাটে বইয়ের পাতায়। পাঠাগারের টেবিলে পাশাপাশি বসে দেখা যায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের, আবার একই সঙ্গে কৃষকরা পড়ছেন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে লেখা বই। কেউ খুঁজছেন সাহিত্য, কেউ ইতিহাস, কেউবা চাকরির প্রস্তুতির জন্য সাধারণ জ্ঞানের বই। সবার লক্ষ্য একটাই নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করা।

স্থানীয় শিক্ষার্থীরা জানান, অনেক পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় সব বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এই পাঠাগারের বইগুলো তাদের লেখাপড়ার বড় সহায়ক হয়ে উঠেছে। নিয়মিত এখানে এসে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষক গোলাম কিবরিয়া (৬৫) ও আফজাল মিয়া (৬৫) বলেন, কৃষিকাজে নতুন প্রযুক্তি, রোগবালাই দমন এবং উন্নত চাষাবাদ সম্পর্কে পাঠাগারের বই থেকে অনেক কার্যকর তথ্য পাওয়া যায়। এসব জ্ঞান বাস্তব কাজেও কাজে লাগছে।

গৃহিণী ফাতেমা আক্তার রিদ্দি ও কামরুল নাহার বেগম বলেন, রান্না, সেলাই, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুর পরিচর্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বই পড়ে তারা নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন। সংসারের পাশাপাশি আত্মউন্নয়নের সুযোগও তৈরি হয়েছে এই পাঠাগারের মাধ্যমে।

চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ আরিফুর রহমান বলেন, ‘চাকরির প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। তাই নিয়মিত এখানে এসে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার বই পড়ি। ভালো প্রস্তুতির জন্য এই পাঠাগার আমার সবচেয়ে বড় ভরসা।’

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ইসহাক মুন্সী (৭২) ও আবু মুসা (৭৫) বলেন, ‘বই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। বই পড়লে মানুষ সচেতন হয়, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে এবং সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে। তাই আমরা চাই গ্রামের নতুন প্রজন্ম বইয়ের সঙ্গেই বড় হোক।’

স্থানীয়দের মতে, এই পাঠাগার শুধু বই পড়ার সুযোগই তৈরি করেনি, বরং গ্রামের মানুষের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ, সামাজিক সচেতনতা ও ইতিবাচক মানসিকতার বিকাশ ঘটিয়েছে। তরুণদের অবসর সময় এখন অনেকটাই গঠনমূলক কাজে ব্যয় হচ্ছে। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, কৃষি, স্বাস্থ্য ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে বই পড়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াচ্ছেন।

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘একটি পাঠাগার শুধু বই রাখার জায়গা নয়; এটি মানুষ গড়ার কারখানা। আমাদের লক্ষ্য, গ্রামের প্রতিটি শিশু, কিশোর, তরুণ এবং সাধারণ মানুষ যেন বইয়ের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে। একজন আলোকিত মানুষই একটি আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই পাঠাগারের যাত্রা।’

ভূতাইল গ্রামের মানুষের কাছে ‘মো. হারুন আল রশিদ (বিএসসি) পাঠাগার’ এখন শুধু একটি পাঠাগার নয়, এটি জ্ঞানচর্চা, আত্মউন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর জানার আগ্রহকে পুঁজি করে এই ছোট্ট উদ্যোগ ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে একটি সচেতন, শিক্ষিত ও আলোকিত প্রজন্ম।