কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ফেরাতে ৮৭০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব

দীর্ঘদিন ধরে কমে যাওয়া উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট সংস্কার ও পুনর্বাসনে ৮৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইউনিট দুটির হারানো ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ফিরে আসার পাশাপাশি বর্ষায় স্পিলওয়ে দিয়ে ছেড়ে দেওয়া অতিরিক্ত পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। সে হিসাবে দুটি ইউনিট থেকে মোট ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। কিন্তু দীর্ঘদিনের যান্ত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে ইউনিট দুটি থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। এতে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৬৫৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ, ২০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা জানান, ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট স্থাপন করা হয় ১৯৮৮ সালে। এর মধ্যে একটি ইউনিট সর্বশেষ ২০১০ সালের জুনে এবং অন্যটি ২০১১ সালের এপ্রিলে সংস্কার করা হয়েছিল। প্রকৌশলীদের মতে, একটি ইউনিটের সাধারণত ১০ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রয়োজন। সেই হিসাবে নির্ধারিত সময়ের অনেকটা পেরিয়ে গেলেও ইউনিট দুটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, ইউনিট দুটির পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। এরপর সাত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু করা যায়নি। এ সময়ে তিন দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিভিন্ন কারণে প্রতিবারই তা বাতিল হয়ে যায়। ইউনিট দুটি তোশিবা প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত শর্ত পূরণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য জটিলতা তৈরি হয়। এর সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ঠিকাদারদের আপত্তিসহ নানা কারণে প্রকল্পটি এগোয়নি। ফলে পূর্ণাঙ্গ ওভারহল ছাড়াই অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি সচল রাখা হয়েছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, বর্ষায় হ্রদের পানি ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছালে অতিরিক্ত পানি স্পিল করতে হয়। এই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো গেলে জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আগে পানি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেটি আর এগোয়নি। এবার নতুন করে ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট সংস্কার ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষায় স্পিল হওয়া পানির পরিমাণ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও বেশি পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে শুধু পুরোনো যন্ত্রাংশ মেরামত নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আওতায় রোটর রিম সাপোর্ট, স্টেটর কয়েল, রোটর পোল, ইনসুলেশন, টারবাইনের রানার, শ্যাফট সিল ও বিয়ারিং সংস্কার বা পরিবর্তন করা হবে। পাশাপাশি গভর্নর, অটোমেশন ও কন্ট্রোল সিস্টেমসহ অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট পুনর্বাসনের জন্য সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগবে।

দীর্ঘদিনের সংস্কার ঘাটতিতে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বর্ষায় বিপুল পরিমাণ পানি স্পিলওয়ে দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্ভাবনাকে আবার সামনে এনেছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে একদিকে হারানো উৎপাদন সক্ষমতা ফিরবে, অন্যদিকে বর্ষার অতিরিক্ত পানির আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে। তবে সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা সংস্কার উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখন নির্ভর করছে প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।