টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কে মধুপুর গড়াঞ্চল অংশে (পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর) বন্যপ্রাণির নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে পাঁচটি বিশেষ রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও দুর্ঘটনা রোধে এই অভিনভ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে রাস্তার দুই পাশের সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে শক্ত দড়ি সংযুক্ত করে এই রোপওয়েগুলো তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন বৃক্ষবাসী প্রাণিরা মাটিতে না নেমেই বনের এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে।
বন্যপ্রাণি গবেষকদের মতে, বর্তমানে মধুপুর জাতীয় উদ্যানে প্রায় ১৯০ প্রজাতির বন্যপ্রাণির আবাস রয়েছে। এরমধ্যে ২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি এবং ২৯ প্রজাতির সাপ ও অন্যান্য প্রাণি রয়েছে। বিশেষ করে, পূর্বে সিলেট ও চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনের অধিবাসী হিসেবে পরিচিত আইইউসিএন (ওটঈঘ) এর লাল তালিকাভুক্ত মহাবিপন্ন ‘বাংলা লজ্জাবতী বানর’-এর বিচরণ ইদানীং মধুপুরের শালবনেও লক্ষ্য করা গেছে। নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের এই বিরল প্রাণিটি মূলত গাছের মগডালে বা বাঁশঝাড়ে বাস করে। বন সংকোচন ও মহাসড়কের কারণে এদের স্বাভাবিক বিচরণ ও খাদ্য সংগ্রহের পথ সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত হচ্ছিল।
টাঙ্গাইল বন বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, মধুপুর গড়াঞ্চলের বুক চিরে আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিকভাবেই বন্যপ্রাণিদের আবাসস্থল খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। খাদ্য সংকট ও বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে রাস্তা পার হতে গিয়ে দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে প্রায়ই লজ্জাবতী বানরসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণি প্রাণ হারাত। নতুন এই রোপওয়ে করিডোর চালুর ফলে এই ঝুঁঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে নির্মিত পাঁচটি রোপওয়ে করিডোরগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বনাঞ্চলের অন্যসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একই ধরনের করিডোর নির্মাণ করা হবে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ জানান, বনাঞ্চলসংলগ্ন মহাসড়কে এ ধরনের বন্যপ্রাণিবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্যপ্রাণির নিরাপদ চলাচলের জন্য রোপওয়ে করিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বণ্যপ্রাণির মৃত্যুহার অনেক কমে আসবে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, মধুপুর শালবন প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় রোপওয়ে করিডোর নির্মাণের ফলে বানর, হনুমান, সিভেটসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণি নিরাপদে চলাচল করতে পারছে। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করা হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যানবাহনের নিচে পিষ্ট হয়ে বন্যপ্রাণির মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমবে।