নিজের ‘চল্লিশা’ নিজেই খাওয়ালেন রফিকুল

সাধারণত কারও মৃত্যুর ৪০ দিন পর আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্র মানুষকে খাওয়ানোর আয়োজন করা হয়। কিন্তু কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে ঘটেছে এর ব্যতিক্রম। মৃত্যুর আগেই নিজের ‘চল্লিশা’র আয়োজন করেছেন ৬২ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম। 

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জুমার নামাজের পর নিজের বাড়ির পাশে প্রায় ৬ হাজার মানুষের জন্য গণমেজবানের আয়োজন করেন তিনি।

জীবিত অবস্থায় এমন আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। শুক্রবার বীর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ দল বেঁধে খাবার খেতে আসছেন। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে পালাক্রমে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। বাড়ি ও মাঠজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।

রফিকুল ইসলাম হোসেনপুর উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে। স্থানীয়দের কাছে তিনি বিত্তশালী হিসেবে পরিচিত। এলাকায় তার কিছু জমিজমা ও ব্যবসা ছিল। সম্প্রতি সরকারি রাস্তা নির্মাণের জন্য তার দোকান ও জমির বড় একটি অংশ অধিগ্রহণ করা হয়। এ বাবদ পাওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়েই মৃত্যুর আগে নিজের ‘চল্লিশা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রফিকুলের চাচাতো ভাই আবদুস সালাম বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রফিকুল নিজে গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় দাওয়াত দিয়েছেন। বাড়িতে শামিয়ানা টানিয়ে বাবুর্চি দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়। আগের রাতেই কয়েকটি গরু ও খাসি জবাই করা হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে বীর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দেখা যায়, একের পর এক মানুষ খাবার খেতে আসছেন। কয়েক দফায় তাদের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। মেনুতে ছিল গরু ও খাসির মাংস, ভাত, খিচুড়ি, মাছসহ বিভিন্ন পদ। আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের উপস্থিতিতে রফিকুলের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা ছিল সরগরম।

জীবিত অবস্থায় নিজের চল্লিশার আয়োজন কেন করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম বলেন, তার বয়স হয়েছে। শারীরিকভাবেও তিনি আগের মতো শক্তি পাচ্ছেন না। পরিবারের সদস্যরাও এখন নিজেদের অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে সম্প্রতি ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পাওয়ায় একসঙ্গে কিছু অর্থ হাতে আসে। এরপর স্ত্রী বেগম আক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে জীবিত অবস্থায় নিজের ‘চল্লিশা’র আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।

রফিকুল বলেন, ‘আমি মারা যাওয়ার পর হয়তো আমার স্বজনেরা সবাইকে ডেকে এভাবে খাওয়ানোর আয়োজন না-ও করতে পারেন। তাই নিজের ইচ্ছায় জীবিত অবস্থাতেই আয়োজনটি করেছি।’

খাবার খেতে আসা একই গ্রামের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বলেন, কেউ মারা যাওয়ার ৪০ দিন পর অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও দরিদ্র মানুষকে খাওয়ানোর আয়োজন করে। তবে জীবিত অবস্থায় নিজের চল্লিশার আয়োজনের ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।

তিনি বলেন, রফিকুল হয়তো মনে করেছেন, মারা যাওয়ার পর স্বজনেরা এত বড় আয়োজন করে সবাইকে খাওয়াতে পারবেন না। তাই নিজের ইচ্ছাতেই জীবিত অবস্থায় প্রায় ৬ হাজার মানুষের জন্য এমন আয়োজন করেছেন।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান বলেন, জীবিত অবস্থায় নিজের চল্লিশার আয়োজন করার কোনো বিধান ইসলামে নেই। একই সঙ্গে মৃত্যুর ৪০ দিন পর ‘চল্লিশা’ পালন করাও ইসলামের বাধ্যতামূলক কোনো বিধান নয়।

তিনি বলেন, মানুষ কখন, কোথায় ও কীভাবে মারা যাবে, তা কেউ আগে থেকে বলতে পারেন না। তাই নিজের মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সময়ে কী আয়োজন হবে, তা জীবিত অবস্থায় নির্ধারণ করার বিষয়টি ধর্মীয়ভাবে সমর্থিত নয়।

তবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে খাবার খাওয়ানো কিংবা মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের আপ্যায়নে ইসলামে বাধা নেই বলেও জানান তিনি।