শাল গজারি ঘেরা বনের ভেতর বিলাসবহুল ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টার। পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীরের দাপটে সরকারি বন ধ্বংস করে গড়ে তোলা হয়েছে পাঁচতারকা মানের এই রিসোর্ট। অবসরে যাওয়ার পর সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক এই ক্ষমতাধর পুলিশ মহাপরিদর্শক ও তার পরিবারের সদস্যদের আদালত সম্পদ জব্দের আদেশ দিলে সামনে আসতে থাকে একের পর এক অপকর্ম।
অভিযোগ উঠেছে, গাজীপুরের বারুইপাড়া মৌজার নলজানি এলাকায় কৌশল করে বনের ভেতরে প্রথমে ব্যক্তিমালিকানা কিছু জমি ক্রয় করেন গড়ে তুলেন ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। পরবর্তীতে বেনজীর আহমেদের অদৃশ্য ক্ষমতায় আশপাশের ৬ একর ৭০ শতাংশ বনের জায়গা দখল করে ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা মালিকরা। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের জিম্মি করে দখল করে নেন প্রায় ৩ একর কৃষি জমি।
গত রোববার (২ জুন) অবৈধ দখলের অভিযোগ এনে গাজীপুরের ভাওয়াল রিসোর্টের মালিক, ম্যানেজার ও একই প্রতিষ্ঠানের অপর ম্যানেজারকে আসামি করে ঢাকার কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল হক, ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা ডা. সিরাজুল হকসহ ছয়জন বাদী হয়ে গাজীপুর প্রথম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন।
অভিযুক্তদের আগামী ৬ নভেম্বর সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে জবাব দাখিলের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।
অভিযোগকারীর আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন সরকার এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মামলার বিবাদীরা বাদীপক্ষের কেনা জমি জোর করে দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেছেন। মামলায় ‘ক’ তফসিলের ১০২ শতাংশ জমি বাদীর ষোলআনা স্বত্ব ঘোষণা করে রায় ও ডিক্রি প্রদান, ‘খ’ তফসিলে ১০২ শতাংশ জমি থেকে স্থাপনা উচ্ছেদ এবং অ্যাডভোকেট কমিশন নিয়োগ করে মাপজোকের মাধ্যমে দখল হস্তান্তরের আদেশ দিতে আদালতের কাছে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বিলাসবহুল রিসোর্টটির দখল বাণিজ্যে মাথা হিসেবে থেকেই ২৫ শতাংশ শেয়ার পেয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ।
এক ভোক্তভোগী শফিউল্লাহ বলেন, রিসোর্টের মূল ফটকের সামনে বানানো পাহাড় ও ভেতরের জমি তাদের ছিল। মূল্য পরিশোধ না করেই জমিটি দখল করে নেওয়া হয়েছে। সেসময় আশপাশে পুলিশি জিম্মি দশায় তারা কথাও বলতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, বেনজীর আহমেদের সাহসেই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এসব করেছে। তার মত আরও স্থানীয় বেশ কয়েকজন দাবি করেছেন, বেনজির আহমেদের ক্ষমতার বলে তাদের জমিও বেদখল করে রেখেছে রিসোর্টটি।
শুধু দখল বাণিজ্য নয় ডিমার্গেসন, প্রশাসনের অনুমোদন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই কী গহীন বনে গড়ে উঠলো এমন রিসোর্ট? আবার স্থানীয় প্রশাসন থাকার পরেও কিভাবে দখল হয়ে গেল বন সম্পদ কিংবা কৃষিজমি- তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা।
এত দিনেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিতে পারেনি কেউ-নাকি দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন সবাই?
এর উত্তর জানতে ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলেও এ নিয়ে কথা বলতে যেন অদৃশ্য এক ভয়ের ছায়া ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মাসুদ রানার মুখে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা এনিয়ে কথা বলতে অপারগ হলেও কৌশলে জানালেন, উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেই বদলি হয়েছিলো ঊর্ধ্বতন তার দুই কর্মকর্তা।
এদিকে অনেকের অভিযোগ, দখলদারদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে দিনের পর দিন নিরব থেকেছে বন বিভাগের কর্তারা। তবে দুদক ও আদালতের তৎপরতায় যেন নড়েচড়ে বসতে চাইছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন।
অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দ্রুতই বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছে গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আদালতে এতদিন স্টে অর্ডার থাকায় কিছু করা যায়নি। এখন আদালত রায় দিয়েছেন, যেকোন সময় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হবে।